তিনমাসেও ধীরাজ হত্যার ক্লু উদ্ধার করতে পারেনি পুলিশ

হত্যাকান্ডের ঘটনাটি ঘটেছিলো দিনদুপুরে। এরপর পেরিয়ে গেছে তিন মাস। কিন্তু তিনমাসেও প্রকাশ্যে সংঘটিত এই হত্যাকান্ডের কোনো ক্লু উদ্ধার করতে পারেনি পুলিশ। ফলে সিলেটের বালাগঞ্জে ইটভাটায় ধীরাজ পাল হত্যা রহস্য এখনো থেকে গেছে অনুদঘাটিত।

গত ২৮ মে দুপুরে বালাগঞ্জ উপজেলার গহরপুরে ইটভাটার ব্যবস্থাপক ধীরাজ পাল (৬০) খুন হন। এ ঘটনায় মামলা দায়েরের পর এখন পর্যন্ত ৬ জনকে গ্রেপ্তার দেখিয়েছে পুলিশ। এরমধ্যে ৫ জনকে রিমান্ডেও নেওয়া হয়। তবে তাদের কাছ থেকে হত্যার ব্যাপারে কোনো তথ্য আদায় করতে পারেনি। এরমধ্যে দুজন জামিনে বের হয়ে গেছেন, বাকী ৪জন জেল হাজতে রয়েছেন।

প্রথমে মামলাটির তদন্ত করছিলো বালাগঞ্জ থানা পুলিশ। পরে থানা জেলা পুলিশের গোয়ন্দো শাখা (ডিবি) তে হস্তান্তর করা হয়। তবে ডিবিতে স্থানান্তরের পরও মামলার তদন্তে আশানুরুপ কোনো অগ্রগতি হয়নি। পুলিশ বলছে, গ্রেপ্তারকৃতদের মধ্যেই হত্যার সাথে জড়িতরা থাকতে পারে।

এ ব্যাপারে মামলার তদন্তকারী কর্মকর্তা ও ডিবির পরিদর্শক মো. ইখতিয়ার উদ্দিন বলেন, আমরা চেষ্টা করে যাচ্ছি। যাকেই সন্দেহ হচ্ছে তাকেই জিজ্ঞাসাবাদ করছি। কিন্তু এখন পর্যন্ত আশাব্যঞ্জক কোনো তথ্য পাইনি। হত্যার কোনো ক্লু উদ্ধার করতে পারিনি।

তিনি বলেন, আমি আশাবাদী এই মামলার রহস্য উদঘাটন করা সম্ভব হবে। তবে কিছুটা সময় লাগবে।

ধীরাজ পাল হত্যার পরদিন ২৯ মে বালাগঞ্জ থানায় অজ্ঞাতনামাদের আসামি করে হত্যা মামলা দায়ের করেন নিহতের বড় ছেলে প্রভাকর পাল বাপ্পা।

মামলার এজাহার ও নিহতের পারিবারিক সূত্রে জানা যায়, ধীরাজ পাল ৮ বছর ধরে গহরপুরের ওই ইটাভাটায় ব্যবস্থাপক হিসেবে কাজ করতেন। তিনি সিলেটের দক্ষিণ সুরমার আলমপুর এলাকার মৃত দিজেন্দ্র পালের ছেলে। ইটাভাটায়ই রাত্রিযাপন করতেন ধীরাজ। প্রতি শুক্রবার সেখান থেকে আলমপুরে নিজ বাড়িতে আসতেন। ২৮ মেও ছিলো শুক্রবার। ওইদিন বিকেলে তার বাড়ি ফেরার কথা ছিলো। তবে শুক্রবার দুপুরেই ইটভাটায় নিজ কার্যালয়ের সামনে মাথা ও শরীর ক্ষতবিক্ষত করে তাকে হত্যা করা হয়। পরে স্থানীয়রা তাকে উদ্ধার করে সিলেট এমএজি ওসমানী মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে নিয়ে আসেন।

মামলার এজাহারে ইটভাটার কর্মীদের বরাত দিয়ে বলা হয়, জুমার নামাজের সময় হত্যা করা হয় ধীরাজ পালকে। এসময়ে সকল কর্মীরা মসজিদে নামাজ পড়তে গিয়েছিলেন। পুরো ইটভাটা ফাঁকা ছিলো।

মামলা দায়েরের পর ৩০ মে ইটভাটার ব্যবসায়িক অংশীদার ও ক্যাশিয়ার মেরাজুল ইসলাম চৌধুরী, সহকারী ব্যবস্থাপক সুহেদ আহমদ ও সিএনজি অটোরিকশা চালক রুবেল আহমদকে গ্রেপ্তার করে পুলিশ। পরদিন আদালতের মাধ্যমে তাদের ৪ দিনের রিমাণ্ডে নেওয়া হয়। এরপর ইকবাল হোসেন নামে এক ট্রাক চালক ও ইটভাটার নৈশপ্রহরী রাসেল আলীকে গ্রেপ্তার করে ৩ দিনের রিমান্ডে নেওয়া হয়। পরে তোফায়েল আহমদ নামে একজনকে গ্রেপ্তার করা হয়।

তবে ৬ জনকে গ্রেপ্তারের পর জিজ্ঞাসাবাদ করেও হত্যাকান্ডের কোনো ক্লু উদ্ধার করতে পারেনি পুলিশ। গ্রেপ্তারকৃত আসামিরাও আদালতে স্বীকারোক্তি প্রদান করেনি। এরমধ্যে সিএনজি অটোরিকশা চালক রুবেল আহমদ রাসেল ও নৈশপ্রহরী রাসেল আলী জামিনে মুক্তি পেয়েছেন। বাকীরা এখনো কারাগারে রয়েছে।

এদিকে, প্রকাশ্যে হত্যাকান্ডের তিন মাস পেরিয়ে গেলেও এখন পর্যন্ত হত্যা রহস্য উদঘাটন না হওয়ায় ক্ষোভ ও হতাশা বিরাজ করছে নিহতের পরিবার ও এলাকাবাসীর মধ্যে।

ধীরাজ হত্যার সুষ্ঠ তদন্ত ও রহস্য উদঘাটনের দাবিতে গত ৩০ মে সিলেট বিভাগীয় কমিশনার কার্যালয়ের সামনে অবস্থান নিয়ে সিলেট-জকিগঞ্জ সড়ক অবরোধ করেন দক্ষিণ সুরমার আলমপুর এলাকাবাসী। এরপর ১০ জুন হত্যা রহস্য উদঘাটনের দাবিতে এলাকাবাসীর পক্ষ থেকে মানববন্ধন ও সিলেটের উপ মহা পুলিশ পরিদর্শক (ডিআইজি) মফিজ উদ্দিন আহম্মদ বরাবর স্মারকলিপি প্রদান করা হয়।

তিন মাসেও হত্যা রহস্য উদঘাটন না হওয়ায় ক্ষোভ প্রকাশ করে নিহতের ছেলে ও মামলার বাদী প্রভাকর পাল বাপ্পা বলেন, একটা নীরিহ লোককে প্রকাশ্যে খুন করে ফেলা হলো অথচ পুলিশ তিনমাসেও কোনো রহস্য উদঘাটন করতে পারলো না। এটি আমাদের পরিবারের জন্য চরম হতাশার। পুলিশের আন্তরিকতা নিয়েই আমাদের মনে প্রশ্ন দেখা দিয়েছে। এভাবে আর কিছুদিন চললে তো আরও অনেক ঘটানার মতো এই হত্যা মামলাও ছাইছাপা পড়ে যাবে। আর আমরা ন্যায়বিচার বঞ্চিত হবো।

এ হত্যাকান্ডের বিষয়ে সিলেটের পুলিশ সুপার (এসপি) মোহাম্মদ ফরিদ উদ্দিন বলেন, পুলিশ এই হত্যারহস্য উদঘাটনে আন্তরিকভাবে চেষ্টা করছে। একারনে থানা থেকে মামলাটি ডিবিতে আনা হয়েছে। কিন্তু দুর্ভাগ্যবশত আমরা এখনো রহস্য উদঘাটন করতে পারিনি। তবে আমার ধারণা যারা গ্রেপ্তার হয়েছে তাদের মথ্যেই হত্যাকারী রয়েছে।

এসপি বলেন, হত্যা রহস্য উদঘাটনে আমরা চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছি।

মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.