আওয়ামী লীগ ও বাংলাদেশের সংবিধান

বি‌শেষ প্রতি‌নি‌ধি::

আজ থেকে ৭২ বছর আগে ১৯৪৯ সালের ২৩ জুন জন্ম হয় বঙ্গবন্ধুর নেতৃত্বের সংগঠন বাংলাদেশ আওয়ামী লীগ। তখন থেকেই পাকিস্তানি শাসকদের রক্তচক্ষুকে উপেক্ষা করে জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান বাঙালি জাতির অধিকার প্রতিষ্ঠার জন্য লড়াই করে একাত্তরের রক্তাক্ত পথ পেরিয়ে ১৯৭২ সালের জানুয়ারিতে ক্ষমতায় আসীন হন। অতঃপর তার যথাযথ নির্দেশনায় প্রণীত হয় গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশের সংবিধান, যা ১৯৭২ সালের ৪ নভেম্বর গণপরিষদে গৃহীত এবং একই বছর ১৬ ডিসেম্বর বিজয় দিবসে কার্যকর হয়।

পাকিস্তান আমলে রাজনৈতিক দল হিসেবে আওয়ামী লীগের বাংলাদেশের শাসনতন্ত্র প্রণয়নের লড়াই এবং বঙ্গবন্ধুর সংগ্রামী জীবনের সব স্বপ্ন, দর্শন ও অঙ্গীকার জনগণের অভিপ্রায় হিসেবে উপস্থাপিত হয়েছে আমাদের সংবিধানের প্রস্তাবনায় এবং এর আলোকে সংবিধানের দ্বিতীয় ভাগে বর্ণিত রাষ্ট্র পরিচালনার মূলনীতিসমূহে। সংবিধানে বিধৃত রাষ্ট্রপরিচালনার মূলনীতিতে স্বীকৃতি পেয়েছে জাতীয় মুক্তিসংগ্রামে আত্মনিয়োগ ও আত্মনিয়োগকারী বীর শহিদদের স্মরণ করে জাতীয়তাবাদ, সমাজতন্ত্র, গণতন্ত্র ও ধর্মনিরপেক্ষতার আদর্শগুলো। অথচ আওয়ামী লীগ ও বঙ্গবন্ধুর নিজ হাতে গড়ে তোলা পৃথিবীর অন্যতম সংবিধানের ওপর প্রথম আঘাত নেমে আসে ১৯৭৫ সালের ১৫ আগস্টের পর। অবৈধভাবে ক্ষমতা দখল করে জিয়াউর রহমান স্বাধীনতাযুদ্ধের শত্রুদের সঙ্গে মৈত্রের বন্ধন গড়ে তোলেন। রাজনীতিতে ধর্মকে একটি গুরুত্বপূর্ণ উপাদান হিসেবে ব্যবহার করতে শুরু করেন। ১৯৭৭ সালে বাংলাদেশের সংসদ চারটি মূল ভিত্তি পরিবর্তনের মাধ্যমে সংবিধান সংশোধন করা হয়, যাতে ধর্মীয় স্বাধীনতা বর্জিত হয়। ১৯৮৮ সালে সামরিক শাসক হুসেইন মুহম্মদ এরশাদ বাংলাদেশে রাষ্ট্রধর্ম ঘোষণা করেন। এটি ছিল দেশের সাংবিধানিক ধর্মনিরপেক্ষতার বিরুদ্ধে সর্বশেষ কাজ। অন্যদিকে সামরিক ফরমানবলে সংবিধানের প্রস্তাবনার প্রথম অনুচ্ছেদের ‘জাতীয় মুক্তির জন্য ঐতিহাসিক সংগ্রাম’ শব্দগুলোর বদলে প্রতিস্থাপন করা হয় ‘জাতীয় স্বাধীনতার জন্য ঐতিহাসিক যুদ্ধের’ প্রসঙ্গ।

বায়ান্ন থেকে একাত্তর দীর্ঘ সময়ে আওয়ামী লীগ স্বাধীনতা ও মুক্তির মন্ত্রে মানুষকে উদ্বুদ্ধ করেছিল বাঙালি জাতীয়তাবাদের ভিত্তিতে। ১৯৭১ সালের ১০ এপ্রিলের স্বাধীনতার ঘোষণাপত্র ও বঙ্গবন্ধুর রাজনৈতিক অভিজ্ঞতা থেকে যে চেতনা জারিত হয়েছিল তা থেকেই সংবিধানের ৩৮ অনুচ্ছেদে ধর্মীয় নামযুক্ত বা ধর্মভিত্তিক সমিতি বা সংঘ গঠন করা বা তার সদস্য হওয়া বা অন্য কোনো তত্পরতায় অংশগ্রহণ নিষিদ্ধ করা হয়। সেই বিধানটিও বিলুপ্ত করা হয়েছিল জিয়া ও এরশাদের সামরিক সরকারের আমলে। আর শেখ হাসিনার আওয়ামী লীগের আমলে তা পুনঃস্থাপিত হয়েছে সংবিধানে।

স্মরণীয়, স্বাধীনতার পর বঙ্গবন্ধুর আমলে ১৯৭২ সালে বাংলাদেশের সংবিধান প্রণয়ন হওয়ার পর প্রথম সংসদের মেয়াদকালে সবচেয়ে বেশি চার বার সংবিধানে সংশোধনী আনা হয়েছিল। কিন্তু তা ছিল বঙ্গবন্ধু ও মুক্তিযুদ্ধের আদর্শকে ধারণ করে। যেমন, সংবিধানের প্রথম সংশোধনী বিল পাশ হয় ১৯৭৩ সালের ১৫ জুলাই। এটি ছিল যুদ্ধাপরাধীসহ অন্য মানবতাবিরোধী অপরাধীদের বিচার নিশ্চিত করার ইস্যু। ১৯৭১ সালের মুক্তিযুদ্ধের পরে এই সংশোধনীর মাধ্যমে যুদ্ধাপরাধীদের বিচার নিশ্চিত করা হয়। ১৯৭৩ সালের ২০ সেপ্টেম্বর সংবিধানের দ্বিতীয় সংশোধনী বিল পাশ হয়। এতে সংবিধানের কয়েকটি অনুচ্ছেদে (২৬, ৬৩, ৭২ ও ১৪২) সংশোধন আনা হয়। অভ্যন্তরীণ গোলযোগ বা বহিরাক্রমণে দেশের নিরাপত্তা ও অর্থনৈতিক জীবন বাধাগ্রস্ত হলে ‘জরুরি অবস্থা’ ঘোষণার বিধান চালু করা হয় এই সংশোধনীর মাধ্যমে। ভারত ও বাংলাদেশের সীমানা নির্ধারণী একটি চুক্তি বাস্তবায়ন করার জন্য ১৯৭৪ সালের ২৩ নভেম্বর এ সংশোধনী আনা হয়। এই সংশোধনীর মাধ্যমে বাংলাদেশ-ভারত সীমান্ত চুক্তি অনুমোদন এবং চুক্তি অনুযায়ী ছিটমহল ও অপদখলীয় জমি বিনিময় বিধান প্রণয়ন করা হয়, যা ২০১৮ সালে শেখ হাসিনার আমলে এসে মীমাংসিত হয়েছে। ১৯৭৫ সালের ২৫ জানুয়ারি এ সংশোধনীর মাধ্যমে বাংলাদেশের শাসনব্যবস্থার পরিবর্তন ঘটানো হয়। সংসদীয় শাসনপদ্ধতির পরিবর্তে রাষ্ট্রপতিশাসিত শাসনপদ্ধতি চালু এবং বহুদলীয় রাজনীতির পরিবর্তে একদলীয় রাজনীতি প্রবর্তনে এই সংশোধনীর মূল কথা।

বঙ্গবন্ধুর পর শেখ হাসিনার আওয়ামী লীগ সরকার সংবিধানকে একাত্তরের চেতনায় স্নাত করার জন্য পঞ্চদশ সংশোধনী সম্পন্ন করে ২০১১ সালে। এই সংশোধনী দ্বারা সংবিধানে ধর্মনিরপেক্ষতা ও ধর্মীয় স্বাধীনতা পুনর্বহাল এবং রাষ্ট্রীয় মূলনীতি হিসেবে জাতীয়তাবাদ, সমাজতন্ত্র, গণতন্ত্র ও ধর্মনিরপেক্ষতার নীতি সংযোজন করা হয়। এই সংশোধনীর মাধ্যমে দেশের স্বাধীনতাযুদ্ধের নায়ক শেখ মুজিবুর রহমানকে জাতির পিতা হিসেবে স্বীকৃতিও দেওয়া হয়। এই সংশোধনীর দ্বারা তত্ত্বাবধায়ক সরকারব্যবস্থা বাতিল করা হয়, জাতীয় সংসদে মহিলাদের জন্য সংরক্ষিত আসনসংখ্যা বিদ্যমান ৪৫-এর স্থলে ৫০ করা হয়। সংবিধানে ৭ অনুচ্ছেদের পরে ৭ (ক) ও ৭ (খ) অনুচ্ছেদ সংযোজন করে সংবিধানবহির্ভূত পন্থায় রাষ্ট্রীয় ক্ষমতা দখলের পথ রুদ্ধ করা হয়। এই সংশোধনীর মাধ্যমে আওয়ামী লীগ গৌরবান্বিত হয়েছে, যা দলটির জন্মদিনে অন্যতম বিষয় হিসেবে অবশ্যই স্মরণযোগ্য। কারণ আওয়ামী লীগের শাসনকালেই ১৯৭৫ সালের ১৫ আগস্ট থেকে ১৯৭৯ সালের ৯ এপ্রিল পর্যন্ত প্রণয়নকৃত সংশোধনীগুলোকে বেআইনি, অকার্যকর ও অস্তিত্বহীন মর্মে হাইকোর্টের ঘোষণাকে কার্যকর করা হয়। হাইকোর্টের রায়ে বলা হয়, ‘সামরিক ফরমানবলে সংবিধানের ‘মূল বৈশিষ্ট্য’ পরিবর্তনের চেষ্টা বেআইনি, অকার্যকর ও আইনের দৃষ্টিতে কখনোই এর অস্তিত্ব ছিল না। সামরিক ফরমানবলে ধর্মনিরপেক্ষ বাংলাদেশকে একটি ‘ধর্মীয় রাষ্ট্রে’ রূপান্তর করা হয়েছে, যা শুধু সংবিধানের মূল ও মৌলিক বৈশিষ্ট্যকেই পরিবর্তন করেনি, বরং স্বাধীনতাসংগ্রামের সর্বোচ্চ একটি অঙ্গীকারের প্রতি বিশ্বাসঘাতকতা।’ হাইকোর্টের এই রায় আপিল বিভাগেও বহাল থাকে। লেখা বাহুল্য, বাংলাদেশ আওয়ামী লীগ না থাকলে এদেশের আদি সংবিধানের মর্যাদা রক্ষা ও একাত্তরের চেতনার পুনঃপ্রতিষ্ঠা সম্ভব হতো না।

মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.