Sylhet Express

ঘুষ নিয়ে ধর্ষণ মামলা রফাদফা করলেন থানা পুলিশ ও মহিলা মেম্বার

0 ১৫০

কিছুদিন আগে গাজীপুর সদর উপজেলার ভাওয়ালগড় ইউনিয়নের মনিপুর গ্রামের (নামাপাড়া) এলাকার সুকুমার দেবনাথের সন্তান অজিত দেবনাথ নামে জয়দেবপুর থানায় একটি ধর্ষণ মামলা হয়।আসামিকে গ্রেপ্তার করার আগে ভাওয়ালগড় ইউনিয়নের ২ নম্বর সংরক্ষিত ওয়ার্ডের মেম্বার শিপনা আক্তার সুমি সালিশি মীমাংসা দেখিয়ে এক লাখ টাকা নিয়ে ভিকটিমদের ৪৮ হাজার টাকা দেয়। বাকি ৫২ হাজার টাকা তিনি আত্মসাৎ করেন। স্থানীয়রা জানিয়েছেন, দেশে মহামারি করোনা সংকট থাকায় তাদের বিচারের আওতায় আনা সম্ভব হয়নি।

গ্রেপ্তারের পরে তাকে ছেড়ে দেওয়ার কথা বলে জয়দেবপুর থানার এসআই মনোয়ার হোসেন ৫০ হাজার টাকা দাবি করে। পরে আসামিপক্ষ ছাড়ানোর জন্য ৩০ হাজার টাকা এসআই মনোয়ারকে ঘুষ দেয়। ঘুষের টাকা নেওয়ার পরও মামলায় কোনও সুবিধা দেয়নি এসআই মনোয়ার।ভিকটিম গাজীপুর জেলার শ্রীপুর উপজেলার স্থায়ী বাসিন্দা। বর্তমানে তিনি গাজীপুর সদর উপজেলার মনিপুর গ্রামের একটি বাড়িতে ভাড়া থাকেন। ভিকটিমের মনিপুর গ্রামের একটি গার্মেন্টস কারখানায় চাকরি করেন।

মামলা সূত্রে জানা যায়, ওইখানে থাকার ফলে আসামি অজিতের সাথে ভিকটিমের প্রেমের সম্পর্ক গড়ে ওঠে। তারই ধারাবাহিকতায় অজিতের বাড়ির পশ্চিম পাশে ভিকটিমকে ডেকে নেয়। তারপর তাকে একটি টিনশেডে রুমে নিয়ে যায়। তখন মুসলিম হয়ে বিয়ের প্রলোভন দেখিয়ে ওইদিন (২১ সেপ্টেম্বর ২০১৯) রাত দশটায় ওই রুমে তাকে একাধিকবার ধর্ষণ করে। পরে ভিকটিম অন্তঃসত্ত্বা হয়ে পড়ে।দীর্ঘ ২৫ সপ্তাহ পার হয়ে গেলেও অজিত ভিকটিমকে বিয়ে না করে নানা টালবাহানা শুরু করে। ভিকটিম অজিতকে বিয়ের জন্য চাপ দিলেও অজিত অস্বীকৃতি জানায়। যার পরিপ্রেক্ষিত (১ এপ্রিল ২০২০) জয়দেবপুর থানায় অজিতকে আসামি করে একটি ধর্ষণ মামলা দায়ের হয়। ওই মামলায় অজিত একাই আসামি।অজিতের নামে মামলা হওয়ার পর ওই দিন সন্ধ্যা সাতটায় তাকে গ্রেপ্তার করে এসআই মনোয়ার। এরপরই আসামিকে ছাড়ানোর জন্য একের পর এক তদবির শুরু হয়।পরে অজিতের চাচা সতীশ চন্দ্র দেবনাথ অজিতকে ছাড়ানোর জন্য স্থানীয় ওয়ার্ড আওয়ামী লীগের সভাপতি কামাল সরকারের দারস্থ হয়।

সতীশ চন্দ্র দেবনাথ জানিয়েছেন, আমার ভাতিজা অজিতকে গ্রেপ্তার করার পরে ভাওয়ালগড় ইউনিয়নের ৬ নম্বর ওয়ার্ড আওয়ামী লীগের সভাপতি কামাল সরকারের কাছে গেলে তিনি আমাকে নিয়ে থানায় যায়। পরে এসআই মনোয়ার কামাল সরকারের সামনে আসামিকে ছাড়ানোর জন্য আমার কাছে ৫০ হাজার টাকা দাবি করে। সভাপতি কামাল সরকারের কথামতো পরদিন সকাল দশটায় আমি মনিপুরের বেলতলী এলাকায় ৩০ হাজার টাকা নিয়ে যাই। ওখানে গিয়ে দেখি কামাল সরকার, এসআই মনোয়ার ও এসআইয়ের সাথে আর একজন সহকারি পুলিশ একসাথে অবস্থান করছেন। পরে কামাল সরকারের কথামতো এসআইয়ের হাতে ৩০ টাকা দেই। পরে তারা দ্রুত ঘটনাস্থল ত্যাগ করার সময় বলেন, ১-২ ঘন্টা পরে থানায় আসেন আসামি ছেড়ে দেবো। পরে থানায় গেলে বলেন, আসামি চালান করে দিছি, কোর্টে যান। কোর্ট থেকে নিয়ে আসেন। এসআই মনোয়ার আমাদের সাথে বেইমানি করেছে। আমরা তার শাস্তি দাবি করছি।

ঘুষ দেওয়ার প্রতক্ষদর্শী স্বাক্ষী স্থানীয় ওয়ার্ড আওয়ামী লীগের সভাপতি কামাল সরকার জানিয়েছেন, আমার চোখের সামনে এসআই মনোয়ার ৩০ হাজার টাকা ঘুষ নিয়েছে। কিন্তু আসামিপক্ষের কোনও কাজ করে দেয়নি।এ ব্যাপারে আসামি অজিতের পিতা সুকুমার দেবনাথ জানিয়েছেন, আমার কাছে টাকা ছিলনা। আমি ধারদেনা করে ৩০ হাজার টাকা যোগাড় করে ওয়ার্ড আওয়ামী লীগের সভাপতি কামাল সরকারের উপস্থিতিতে এসআই মনোয়ারকে টাকাটা দেই। আমি সামান্য একজন গার্মেন্টস শ্রমিক। ওই ধার করা টাকা এখনও পরিশোধ করতে পারিনি। টাকাটা পরিশোধ করার জন্য আমাকে চাপ দিচ্ছে। এসআই মনোয়ার এতোগুলো টাকা শুধ শুধু নিয়েছে।

সতীশ চন্দ্র দেবনাথ যার কাছ থেকে ধার করে পুলিশকে টাকা দিয়েছিলেন তার নাম দিনন্দ্র চন্দ্র বর্মণ। তিনি জানিয়েছেন, গ্রেপ্তারের পরদিন সকাল ছয়টায় অজিতের চাচা সতীশ চন্দ্র দেবনাথ আমার কাছে ৫০ হাজার টাকা ধার চায়। পরে আমি তাদেরকে বলি এতো টাকা আমার হাতে নেই। আমি দেখি কি করা যায়। ঘন্টাখানেক পরে আমি ৩০ হাজার টাকা ম্যানেজ করে তাদের ধার দেই। পরে ওই টাকা অজিতকে ছাড়ানোর জন্য আমি পুলিশকে দিতে দেখেছি। ওই টাকা তারা আমাকে এখনও ফেরত দেয়নি।

আাসামির অজিতের পিতা আরও জানিয়েছেন আমার সন্তানের বিষয়টি জানাজানি হলে স্থানীয় ২ নম্বর সংরক্ষিত ওয়ার্ড মেম্বার শিপনা আক্তার সুমি সালিশের মাধমে প্রথমে ২ লাখ টাকা দাবি করে ঘটনা মীমাংসা করার জন্য। পরে এক লাখ টাকা নিয়ে তিনি আপোস-মীমাংসা করে দেন। এরপর এ বিষয়ে পরে জানতে পারি মেয়েপক্ষকে মাত্র ৪৮ হাজার টাকা দেওয়া হয়। আর বাকি ৫২ হাজার টাকা গেলো কোথায় ?এ প্রশ্নের উত্তর আমি জানি না। এরপর তিনি আরও বলেন, সালিশে মীমাংসায় আমার কাছ থেকে জরিমানা নিলেন এক লাখ টাকা, পুলিশ আসামি ছাড়ার কথা বলে হাতিয়ে নিলেন আরও ৩০ হাজার টাকা। আমি সংখ্যালঘু (হিন্দু) বলে আজ কোথাও সঠিক বিচার পাচ্ছি না। আমার একমাত্র সন্তান এখনও কারাগারে রয়েছে। তবে আমাকে ধোকা দিয়ে শিপনা আক্তার সুমি ও জয়দেবপুর থানার এসআই মনোয়ার দুইজনে এক লাখ ৩০ হাজার টাকা নিয়েছে। আমি আমার সকল টাকা ফেরতসহ তাদের শাস্তি দাবি করছি।

আমি তখন মেম্বারকে বারবার বলেছি, আমি ৩ মাসের অন্তঃসত্ত্বা’। আমি আমার সন্তানের স্বীকৃতি চাই। কিন্তু মেম্বার তখন বলেছে এটা সম্ভব না। গর্ভের সন্তানের বিষয়টা পরে দেখবো। তিনি সঠিক বিচার না করায় আমি তার শাস্তি দাবি করছি এবং আমার সন্তানের স্বীকৃতি দাবি করছি।এ ব্যাপারে অভিযুক্ত জয়দেবপুর থানার এসআই মনোয়ার হোসেন জানিয়েছেন, ‘তাদের থেকে কোনও টাকার ব্যাপারে আমার জানা নেই।এ ব্যাপারে জয়দেবপুর থানার ওসি জাবেদুল ইসলামকে একাধিকবার ফোন করলে তিনি রিসিভ করেননি। মেসেজ পাঠানোর পরও তিনি কোনও উত্তর দেননি।স্মরণীয়, গত ৩ এপ্রিল ২০২০ তারিখে যোগফলে “মনিপুরে ধর্ষণ মামলার রফাদফার অর্ধলাখ টাকা আত্মসাৎ করেছে মহিলা মেম্বার” এই শিরোনামে একটি অনুসন্ধানী খবর প্রকাশ হয়েছিল। ওই খবরে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম ফেসবুকে নানা মন্তব্য করে তার শাস্তি দাবি করেছেন।যোগফলে সংবাদ প্রকাশের পর তৃতীয় পক্ষের মাধ্যমে যোগফলে একটি প্রতিবাদ লিপি পাঠানোর কথা বলে পরে আর পাঠাননি। ফলে ওই মেম্বারের কৈফিয়ৎ জানা সম্ভব হয়নি। ওই মেম্বার গাজীপুর-৩ আসনের এমপি ইকবাল হোসেন সবুজের সাথে তার সুসম্পর্ক রয়েছে বলে দাবি করে।

মন্তব্য
Loading...