Sylhet Express

ক্রমেই জৌলুস হারাচ্ছে কুলাউড়ার পৃথিমপাশা জমিদার বাড়ি : ‘সাব বাড়ী’

0 ৫৯৬

কুলাউড়া প্রতিনিধি::পৃথিমপাশার জমিদার বাড়ি বা পৃথিমপাশার নবাব বাড়ি। আঞ্চলিকভাবে বলা হয় ‘সাব বাড়ী’। বাড়জমিদারির অনেক স্মৃতি বিজড়িত ঐতিহাসিক এই বাড়িতে এখনও উত্তরাধিকারীরা বসবাস করছেন। কয়েকশ বছরের পুরোনো কারুকার্য সমৃদ্ধ স্থাপনাগুলো যেন পুরানো জৌলুস নিয়ে কোনরকম তার অতীত ঐতিহ্যকে আকড়ে আছে। এমন জমিদার বাড়ির মত জীবন্ত বাড়ি সিলেট বিভাগ তথা গোটা দেশে দ্বিতীয়টি সম্ভবত নেই। সিলেট বিভাগের মৌলভীবাজার জেলার কুলাউড়া উপজেলার পৃথিমপাশা ইউনিয়নের এই জমিদার বাড়ি নিয়েই বিশেষ প্রতিবেদন।

বাইরে থেকে একটি বাড়ি মনে হলেও পৃথিমপাশার জমিদার বাড়িটি দুটি ভাগে বিভক্ত। আলী আমজদ খানের উত্তরাধিকারী আলী হায়দান খান ও আলী আজগর খান এর আমল থেকে দুটি বাড়িতে বিভক্ত হয়। তবে বাইরে থেকে বুঝার উপায় নেই ভেতরের এ বিভক্তি।

জানা গেছে, বাংলাদেশ স্বাধীনতার লাভের পর ১১টি সংসদ নির্বাচনের মধ্যে ৪ বার এই জমিদার পরিবারের লোকজন সংসদ সদস্য নির্বাচিত হয়েছেন। ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যানও অসংখ্যবার নির্বাচিত হন এই পরিবারের লোকজন। উত্তরসূরীদের দাবি- এখনও মানুষ তাদের ভালোবাসে এবং সম্মান ও মর্যাদা দেয়।

প্রায় ৩৫ একর জায়গা জুড়ে সুবিশাল সাজানো-গোছানো জমিদার বাড়িটির স্থাপত্য শিল্পের কারুকার্য এখনও নজর কাড়ে। পুরোনো কয়েকটি স্থাপনার সঙ্গে রয়েছে শিয়া সম্প্রদায়ের একটি চমৎকার নকশা খচিত ইমামবাড়া। প্রত্যেকটি স্থাপনাতে আভিজাত্যের ছাপ স্পষ্ট। পাশেই রয়েছে চমৎকার শান বাঁধানো ঘাটসহ সুবিশাল দীঘি।

এই বাড়ির ভেতর সবকিছু পুরানো আমলের কারুকাজখচিত মনে হলেও সেগুলো পরিষ্কার ঝকঝকেই আছে এখনো। জমিদারদের ব্যবহার করা অনেক জিনিসপত্র রয়েছে এ বাড়িতে। রক্ষণাবেক্ষণ করার জন্য এখানে লোক রয়েছে। আলী আমজাদ খাঁনের উত্তরসূরীরাই দেখাশুনা করেন জমিদার বাড়িটি।

জমিদার বাড়ির ইতিহাস ও ঐতিহ্য নিয়ে জানতে কথা হয় জমিদারদের বর্তমান উত্তরসুরি এবং মৌলভীবাজার ২ আসনের সাবেক সংসদ সদস্য নওয়াব আলী আব্বাছ খান এবং তারই চাচাতো ভাই নবাবজাদা আলী ওয়াজেদ খান বাবুর সাথে। ইতিহাস বলছে দোর্দন্ড প্রতাপশালী বেশির ভাগ জমিদারই ছিলেন প্রজা নির্যাতনকারী। তবে পৃথিমপাশার জমিদারদের বর্তমান উত্তরসূরীদের দাবি- পৃথিমপাশার জমিদাররা মুলত ইসলাম ধর্ম প্রচার করেছেন। তারা মানুষের কল্যাণে বা মানবসেবায় আত্মনিয়োগ করায় এই অঞ্চলের মানুষের হৃদয়ে একটা শ্রদ্ধার জায়গা করে নিতে পেরেছিলেন। এ কারণে এখনও তারা টিকে আছেন। বর্তমানে ধর্মীয় কাজ খুব একটা পরিচালিত না হলেও মানবসেবার কাজ বর্তমানে অব্যাহত আছে।

আলী আব্বাছ খান ও আলী ওয়াজেদ খান বলেন, জমিদারি আমলে তাদের রাজস্ব আসতো ১১ লাখ টাকা। জমিদারি প্রথা উচ্ছেদের পর এখন বাঁচার জন্য তাদের কাজ করতে হয়। ১৯৭১ সালে পাক বাহিনী আর ৮৩ সালে স্বৈরাচার বাহিনী বাড়িটি ধ্বংসের চেষ্টা চালায়। তাদেরকে অনেকবার দেশদ্রোহী হিসেবে চিহ্নিত করার অপচেষ্টা চালানো হয়। অপূরনীয় ক্ষতি হলেও পুরানো স্থাপত্য শিল্প আর অতীত ঐতিহ্যকে কোনমতে আকড়ে আছেন। তবে জীবিকায়নের জন্য ইংল্যান্ড আমেরিকায় পাড়ি জমিয়েছেন অনেকে।

পৃথিমপাশা জমিদার বাড়ির ইতিহাস থেকে জানা যায়, মুঘল সম্রাট আকবরের আমলে ভারতবর্ষে ধর্ম প্রচারে আসেন সাকি সালামত খান। তার ছেলে ইসমাইল খান উড়িষ্যার গভর্নর থাকাকালে দাউদ খান কররানীর সাথে যুদ্ধ হলে তিনি ভারত থেকে পৃথিমপাশায় অবস্থান নেন। খানে জাহান খান হিসেবে পরিচিত ইসমাইল খানের নামে পৃথিমপাশার জমিদার বাড়ির দিঘীর নামকরণ করা হয়। জমিদার বংশের উত্তরাধিকারী মৌলভী মোহাম্মদ আলী খান ১৭৭৩ সালে সিলেটের সহকারি কাজী ছিলেন। তার ছেলে গৌছ আলী খান সিলেট শেখঘাট কলোনী প্রতিষ্ঠা করেন। তার ছেলে আলী আহমেদ খান সিলেট কিনব্রিজের পাশে ছেলের নামে আলী আমজদের ঘড়িটি স্থাপন করেন। এই আলী আমজদের সময়ে মৌলভীবাজার জেলা সদরে আলী আমজদ বালিকা উচ্চ বিদ্যালয়, বাড়ির পাশে আলী আমজদ উচ্চ বিদ্যালয়সহ বিভিন্ন কল্যাণমুখী ও সেবামুলক প্রতিষ্ঠান গড়ে উঠে।

আলী আমজদের দুই পুত্র ছিলেন। আলী হায়দার খান ও আলী আজগর খান। তাদের আমলেই মুলত বাড়ির অভ্যন্তরে দুটি ভাগ হয়ে যায়। আলী হায়দার খানের দুই পুত্র ছিলেন তারা হলেন আলী ছফদর খান ওরফে ‘রাজা সাহেব’ ও আলী ছরওয়ার খান ওরফে ‘চুন্নু নবাব’। এরমধ্যে আলী ছফদর খান রাজা সাহেব ছিলেন সবচেয়ে আলোচিত এক নাম। এই রাজা সাহেব জমিদারি প্রথাবিরোধী আন্দোলন করে সাধারণ মানুষের ব্যাপক ভালোবাসা কুড়াতে সক্ষম হন। স্বাধীনতা যুদ্ধে সক্রিয় অংশগ্রহণ করেন। আওয়ামী মুসলিম লীগের মহকুমা সভাপতির দায়িত্ব পালন করেন। জীবনের শেষ মুহূর্ত পর্যন্ত মাওলানা ভাসানীর নেতৃত্বে ন্যাপের রাজনীতি করেন। অপর পুত্র আলী ছরওয়ার খান ওরফে চুন্নু নওয়াব ১৯৭০ সালের প্রাদেশিক পরিষদের নির্বাচনে আওয়ামী লীগের প্রার্থী হিসেবে বিজয়ী হন। স্বাধীনতা পরবর্তী ১৯৭৩ সালের উপ-নির্বাচনে কুলাউড়া আসনের প্রথম এমপি নির্বাচিত হন।

জমিদার পরিবারের বর্তমান উত্তরাধিকারী আলী ছফদর খান রাজা সাহেবের পুত্রদের মধ্যে নওয়াব আলী আব্বাস খান ১৯৮৮ সালে, ১৯৯১ সালে, ২০০৮ সালে জাতীয় সংসদ নির্বাচিত হন। আরেক ছেলে নবাব আলী নকী খান ২ বার ইউনিয়ন পরিষদ চেয়ারম্যান নির্বাচিত হন। অপর ছেলে নবাব আলী বাখর খান হাসনাইন বর্তমান পৃথিমপাশা ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান।

মুঘল আমল থেকে অনেক জ্ঞানী গুণিরা পৃথিমপাশা জমিদার বাড়ির আতিথেয়তা গ্রহণ করেছেন। এরমধ্যে ১৯৫১ সালে ইরানের রাজা রেজা শাহ পেহলভী অন্যতম। এছাড়া ইসলামী কবি সাহিত্যিকদের পদার্পণ বেশি ঘটে।

এখনও পৃথিমপাশার জমিদার বাড়িতে প্রতিনিয়ত মানুষের ভিড় জমে। কেউ আসেন দেখতে। কেউ নান্দনিক সৌন্দর্য্যরে সাথে নিজেকে একটি ফ্রেমে বেঁধে রাখতে ছবি তোলেন। শত শত বছরের পুরানো ঐতিহ্যের ধারক পৃথিমপাশার এই জমিদার বাড়িটি দর্শণার্থীদের কাছে দিনে দিনে ব্যাপক জনপ্রিয় হয়ে উঠছে।

মন্তব্য
Loading...