যে ভাবে জৈন্তাপুরে উদ্ধার করা হয়েছিল তিন‘শ বছরের পুরাতন শিলালিপি……..

জৈন্তাপুর সংবাদদাতা::     সিলেটের জৈন্তাপুর উপজেলার সারীঘাট থেকে অন্তত ৩শ’ বছর আগের আনুমানিক ৩৫ কেজি ওজনের পাথরের খোদাই করা শিলালিপিটি সংরক্ষণের জন্য কয়েক বছর জৈন্তাপুর থানা হেফাজতে থাকার পর একটি সংস্থা সংরক্ষণের কথা বলে উদ্বার হওয়া শিলালিপি নিয়ে গেছে বলে জানা যায। এটা কোথায় সংরক্ষণ করা হয়েছে এ বিষয়ে কার কাছে সঠিক কোন তথ্য নেই।

উপজেলার সারীঘাট টুপী মটের টিলার রামেশ্বর শিব মন্দীরের আঙ্গিনা থেকে বিগত ২০০৭ সালের ২৩শে মার্চ উদ্ধার করা হয়েছিল। উদ্ধার হওয়া শিলালিপি সংরক্ষনের জন্য দেবালয় পরিচালনা কমিটির সাধারণ সম্পাদক অমূল্য চরণ পাল ও জৈন্তিয়া শেকঁড় সন্ধানী গ্রুপের সদস্য সচিব সাংবাদিক নূরুল ইসলাম তৎকালীন উপজেলা নির্বাহী অফিসার জিল্লুর রহমান চৌধুরীর কাছে হস্তান্তর করেন। পরবর্তী সময়ে জৈন্তাপুর থানার অফিসার (ইনচার্জ) জাহাঙ্গীর আলম ভূঁইয়ার কাছে প্রেরণ করা হয়েছিল। ঐ সময় থানায় রক্ষিত শিলালিপি পাথরটি দেখতে বিভিন্ন এলাকার লোকজন জড় হন। কয়েক বছর জৈন্তাপুর থানা হেফাজতে থাকার পর শিলালিপিটা সংরক্ষনের কথা বলে একটি সংস্থা নিয়ে যায়। বর্তমানে শিলালিপিটা কোথায় সংরক্ষণ করা হয়েছে তার সঠিক কোন তথ্য পাওয়া যাচ্ছে না।

যে ভাবে শিলালিপি‘র সন্ধ্যান পাওয়া গিয়েছিল। বিগত ২০০৭ সালের ২২শে মার্চ রাতে সারিঘাট ঐতিহাসিক টুপির মট সংলগ্ন এলাকার রামেশ্বর শিব মন্দিরে তিনদিন ব্যাপী অষ্টপ্রহর কীর্ত্তন চলছিল। রাতে প্রচুর বৃষ্টিপাত হওয়া পানি চলাচলের জন্য দেবালয় আঙ্গিনায় একটি নালা খনন করা হয়। নালা খনন করতে গিয়ে মন্দিরের দক্ষিণ পূর্ব পাশে একটি বেলগাছের নিচে প্রথমে শিলালিপিটি দেখতে পান স্থানীয়রা। রাতে খননকারীরা পাথরটি তেমন গুরত্ব না দিয়ে অদূরে সরিয়ে রাখেন। পরদিন সকলে রাতের বৃষ্টিতে পাথরের গাঁয়ে লেগে থাকা কাঁদা কিছুটা পরিস্কার হলে স্থানীয়রা পাথরটিতে খোদাই করা লেখা দেখতে পান। এসময় পূজারিরা পাথরটি পরিস্কার করে মন্দিরের সামনে এনে রাখেন। এর মধ্যে পাথর পাওয়ার সংবাদ চারিদিকে ছড়িয়ে পড়লে লোকজন পাথরটি এক নজর দেখার জন্য ছুটে আসেন। পাথরের গাঁয়ে শৈলপিক ও কারু কাজ করা সংস্কৃত ও নাগরী ভাষায় লেখা রয়েছে। পাথরে অঙ্কিত লেখাটি সম্পূর্ণ পড়া না গেলেও পাথরে লেখা রয়েছে ১৭১৯। লেখার শুরুতে নমঃ ও শিবা লেখা ছিল। পাথরটির গাঁয়ে মোট ৯টি লিখিত লাইন রয়েছে। পাথরটির দৈর্ঘ্য প্রায় সোয়া ১৯ ইঞ্চি, প্রস্থ ১৩.৭৫ ইঞ্চি এবং উচ্চতায় প্রায় সাড়ে ৩ ইঞ্চি। পাথরে খোদাই করা পংক্তি ছাড়াও সুন্দর ফুল ও পাতার দৃশ্য অঙ্কিত ছিল।

অনুসন্ধানে জানা গেছে, ১৭০০ সালের দিকে জৈন্তিয়া রাজ্যের রাজা রাম সিংহের শাসনামলে জৈন্তিয়া অঞ্চলে বহু মট-মন্দির স্থাপন করা হয়। উদ্ধার করা শিলালিপি তৎকালীন রাজা রাম সিংহের শামনামলের বলে ধারনা। পরবর্তী সময়ে সিলেট, শ্রীহট্র সংস্কুত কলেজের উপদেষ্টা এডভোকেট সন্তেষ কান্তি ভট্রাচার্য শিলা লিপিটির গায়ের লিখা পাঠ উদ্ধার করেন। এতে লেখা ছিল ভারতীয় শকাব্দ ১৭১৯ অর্থৎ-১৭৯৭সনে রাজা রাম সিংহ পালের অনুমতিতে তদীয় স্মৃতি রক্ষার্থে পাপ বিমোচনের উদ্যোশে অত্র শিবমন্দীর নির্মাণ করিয়া তাহাতে শিবলিঙ্গ স্থাপন করা হইল। রাম সিংহ রাজার পূর্বেই এই শিব পূজিত হইতেন। পাহাড়ের চূড়ায় অতি সুন্দর মনোরম পরিবেশে বৃক্ষাদি পরিবেষ্ঠিত স্থানে সৌধ আকারে শিবমন্দীর নির্মিত হয়। বৈশাখদি মাস বিচারে সম্ভবত শ্রাবণ মাসে তা নির্মিত হয়। অগ্রহায়নাদি মাস বিচারে তা সম্ভবত ফাল্গুন মাসে নির্মিত হয়। কৈলাশতীর্থ সমতুল্য এই স্থানটি সর্বদায় পাখির কলরবে মূখরিত বৃক্ষাদি শোভিত সিন্ধুর ন্যায় উচ্চাষিত স্থানে কীর্তনাদি হইত। শ্রী রামসিংহ পাল নামক ভূপাল অর্থৎ নৃপতির অনুমতিতে তাহা লিখিত হইল। ইতি। ভারতীয় শকাব্দ-১৭১৯।

এ বিষয়ে জৈন্তিয়ার ইতিহাস-ঐতিহ্য বইয়ের লেখক জৈন্তাপুর প্রেসক্লাবের সাধারণ সম্পাদক সাংবাদিক ও গবেষক নূরুল ইসলাম জানান, পুরাতন এই শিলালিপি উদ্বার হওয়ার প্রমাণ করে জৈন্তিয়ার এক সময় সভ্য জনপদের অস্থিত ছিলো। জৈন্তাপুর উপজেলার নতুন প্রজন্মের কাছে পুরাতন নিদর্শনগুলো স্থায়ী ভাবে সংরক্ষণ করা হলে এবং সঠিকভাবে রক্ষনাবেক্ষন করলে জৈন্তিয়া বাংলাদেশের মধ্যে একটি আকর্ষনীয় পর্যটন কেন্দ্র হিসাবে লাভ করবে। প্রশাসনের উদাসিনতারকারনে এসব সম্পদ বিনষ্ট হয়ে যাচ্ছে। শিলালিপি উদ্বার হওয়ার পর শাহজালাল বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের নৃ-বিজ্ঞান বিভাগের প্রধান অধ্যাপক আব্দুল আউয়াল বিশ্বাস পাথরটি দেখতে আসেন। তখন তিনি বলেন , জৈন্তিয়া এলাকার মাটির নিচে প্রাচীন কালের আরও অনেক প্রত্নতাত্ত্বিক নিদর্শন রয়েছে। যে স্থানে শিলালিপি পাওয়া গেছে সেখানে খনন কাজ করলে আরো অনেক পাথর পাওয়া যেতে পারে। ৩শ’ বছর আগের উদ্ধার হওয়া শিলালিপি যথার্থ স্থানে সংরক্ষণ করা উচিত।

এ ব্যাপারে জৈন্তাপুর উপজেলা পরিষদ চেয়ারম্যান জয়নাল আবেদীন জানান, সারীঘাট ঢুপির মটের টিলার শিব মন্দিরে পাওয়া শিলালিপি আমাদের মহা-মূল্যবান সম্পদ। জৈন্তিয়ার বিভিন্ন স্থানে ছড়িয়ে ছিটিয়ে থাকা পুরাতন নিদর্শন সংরক্ষনের জন্য সরকারী ভাবে উদ্যোগ গ্রহন করা হবে।
জৈন্তাপুর ইমরান আহমদ মহিলা সরকারী ডিগ্রী কলেজের সহকারী অধ্যাপক খায়রুল ইসলাম বলেন, শিলালিপিটি উদ্ধার হওয়ায় জৈন্তিয়ার ইতিহাস আরো সমৃদ্ধ হয়েছে। তিনি জৈন্তিয়ার প্রত্নসম্পদ সংরক্ষণে প্রশাসন কে এগিয়ে আসার অনুরোধ জানান।

মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.