বিদেশে রপ্তানি হচ্ছে সিলেটের তেজপাতা

0 ২৪১

দেশের গণ্ডি পেরিয়ে বিদেশেও রপ্তানি হচ্ছে সিলেটের জৈন্তাপুরের উৎপাদিত তেজপাতা। আর মূল্যবৃদ্ধি ও ব্যাপক চাহিদা থাকায় এ খাতে বিনিয়োগকারীরাও অর্থনৈতিকভাবে লাভবান হচ্ছেন।

জৈন্তাপুর, গোয়াইনঘাট, সিলেটসহ স্থানীয় চাহিদা মিটিয়ে বিদেশে যাচ্ছে এখানকার উৎপাদিত তেজপাতা। ইংল্যান্ড (লন্ডন), আমেরিকা, মধ্যপ্রাচ্যের সৌদি আরব, কুয়েত, দুবাই, কাতার, বাহরাইন, লেবাননসহ বেশ কয়েকটি দেশে সিলেট, ঢাকা, চট্টগাম হয়ে এসব তেজপাতা বিদেশে রপ্তানি হয়ে থাকে। বিমান, নৌ পথে বিদেশে যায় এসব তেজপাতার চালান।

এ অঞ্চলের অনেক যুবক কিশোররা এখন তেজপাতাকে আয় রোজগারের বাড়তি ও বিকল্প মাধ্যম হিসাবে নিতে শুরু করেছেন। সৌখিনের পাশাপাশি এ শিল্পে জড়াচ্ছেন অনেক কৃষক পরিবারের সদস্যরাও। তবে উপজেলা স্থানীয় কৃষি বিভাগের পর্যাপ্ত দেখভালসহ সহযোগিতা না থাকায় সনাতন পদ্ধতিতেই চলে আসছে লাভবান এ খাতের চাষাবাদ ও উৎপাদন।

তেজপাতা একটি সুগন্ধি পাতা। মাংস, মাছ, পোলাও, বিরিয়ানি, সেমাই, ফিরনি, পায়েসসহ মুখরোচক সব খাবারের বাড়তি সুগন্ধি পেতে পাচকরা এ পাতা ব্যবহার করে থাকেন। বিশেষ করে সিলেটের মানুষের ঘরে ঘরে তেজপাতার ব্যবহার থাকে বছরজুড়েই। সিলেটি মানুষজন যেখানেই আছেন সেখানেই সরব উপস্থিতি তেজপাতার।

সিলেটের জৈন্তাপুর উপজেলার ৫নং ফতেহপুর ইউনিয়নের হরিপুর, উৎলারপাড়, শিকারখাঁ, উমনপুর, চিকনাগুল, শ্যামপুর, বাঘেরখাল, নিজপাটের কমলাবাড়ি, গৌরি শংকর, ফুলবাড়ি, গোয়াবাড়ি, ঢুপি, ডৌডিক, রুপচেং, কাপরাংঙ্গি, থূবাং, লালাখালসহ আশপাশের টিলা-পাহাড় বেষ্টিত গ্রামসমূহের বাড়িতে বাড়িতে প্রচুর তেজপাতার গাছ দেখা যায়। কোন কোন বাড়ির টিলায় সারিবদ্ধভাবে লাগানো আছে তেজপাতার গাছ। আবার কোন কোন বাড়িতে ফলমূলের গাছের সাথে রোপনকৃত তেজপাতা গাছ থেকে উৎপাদন করা হয় প্রচুর সুগন্ধি তেজপাতা।

উল্লেখিত এলাকাসমূহে প্রায় সারা বছরই তেজপাতার উৎপাদন ও সরবরাহ লক্ষ করা যায়। সোমবার (২৫ জুন) সরেজমিনে উপজেলার হরিপুর ফতেহপুর ইউনিয়নের বাঘেরখাল, উমনপুর পরিদর্শনে কথা হয় কয়েকজন তেজপাতা উৎপাদনকারীর সাথে। তারা জানান, সেই বাপ-দাদার আমলের মান্ধাতার চাষাবাদ পদ্ধতি অনুসরণ করেই চলে আমাদের এ লাভজনক কৃষি পণ্যের উৎপাদন, পরিচর্যা, রক্ষণাবেক্ষণ, ফলন ও উৎপাদন।

হরিপুর শ্যামপুরের তেজপাতার পাইকারি বিক্রেতা হাজি জহিরুল আমিন জানান, ৪৬ বছর থেকে তিনি এ ব্যবসায় জড়িত। কার্তিক থেকে অগ্রহায়ণ মাস তেজপাতার মৌসুম। এ সময়ই উৎপাদিত তেজপাতা কেটে সংগ্রহ করা হয়। এ সময় দেশের বিভিন্ন নামীদামী প্রতিষ্ঠান যেমন-বনফুল, এসিআই, বিডি ফুডসহ অনেক প্রতিষ্ঠান আমাদের কাছ থেকে তেজপাতা সংগ্রহ করে। তাদের বিদেশি শাখায়ও প্রচুর পরিমাণে রপ্তানি করা হয় এসব তেজপাতা।

তাঁর বাগানে ২০ হাজারেরও বেশি তেজপাতা গাছ রয়েছে, যা থেকে বছরজুড়েই পাতা সংগ্রহ করা সম্ভব। ১০০ টাকা কেজি দরে এসব তেজপাতা বিক্রি করে বছরে ৪ থেকে ৫ লক্ষ টাকা আয় করতে পারেন বলে তিনি জানান।

আজিদ উল্যাহ, আবুল, কাশেম, আব্দুল কাদিরসহ বেশকজন তেজপাতা চাষি জানান, অল্প পুঁজি বিনিয়োগ করে সর্বোপরি লাভবান হওয়ার মতো এমন প্রকল্প এটি। এখানে বিনিয়োগকারীরা বেকারত্ব ঘুচিয়ে স্বাবলম্বী হতে পারে সহজেই।

এতদস্বত্বেও সম্ভাবনাময় এ খাতে নেই সরকারি পৃষ্ঠপোষকতা। চাষাবাদ, রোগ বালাইসহ তথ্যাবদানে আমরা উপজেলা কৃষি বিভাগ কিংবা মাঠ পর্যায়ের উপসহকারী কৃষি কর্মকর্তাদের কোন নুন্যতম সহযোগিতা পাই না, যে কারণে গাছ রোপণ, পাতা উত্তোলনে আমরা মান্ধাতার আমলের কৃষি আবাদে আবদ্ধ আছি। আর এ কারণেই লাভবান এ কৃষিখাতের উন্নয়নে অন্তরায় হয়ে দাঁড়িয়েছে। মান্ধাতার আমলের আবাদ পদ্ধতি, গাছ রোপণ, পরিচর্যায় এখনো আবদ্ধ থাকায় ব্যহত হচ্ছে এখানকার তেজপাতা উৎপাদন প্রক্রিয়া।

জৈন্তাপুর প্রেসক্লাবের সাধারণ সম্পাদক সাংবাদিক নুরুল ইসলাম জানান, হরিপুরসহ আশপাশের টিলাশ্রেনীর মাটিতে তেজপাতার ফলন অত্যন্ত ভালো হয়ে থাকে। আমার মনে হয় ব্যক্তি মালিকানাধীন এসব টিলায় তেজপাতা রোপনকারীদের সরকারি পৃষ্টপোষকতায় নিয়ে আসলে তাদের পাশাপাশি সরকারও রাজস্ব আদায় সাপেক্ষে লাভবান হবেন। আমি সরকারের সংশ্লিষ্ট বিভাগকে এ ব্যাপারে দ্রুত ব্যবস্থা নেয়ার দাবি জানাচ্ছি।

এ ব্যাপারে জৈন্তাপুরের উপজেলা কৃষি অফিসে বারবার ফোন করলেও কাউকে পাওয়া যায়নি।

জৈন্তাপুরের উপজেলা নির্বাহী অফিসার মৌরিন করিম জানান, জৈন্তাপুর উপজেলার মাটির সাথে মানানসই ফল, ফসল, জীববৈচিত্র্য রক্ষায় সরকারের নানামুখী উদ্যোগ নেয়া আছে। তেজপাতা একটি লাভজনক কৃষি ফসল। এ খাতে বিনিয়োগকারী ও জড়িতদের যে কোন সহযোগিতায় আমরা প্রস্তুত আছি। সহজ শর্তে কৃষি ঋণসহ তেজপাতা চাষিদের প্রয়োজনে সরকারি অর্থ বরাদ্দ করা হবে।

মন্তব্য
Loading...