ফেসবুকে একজনের স্ট্যাটাস আরেকজন কি পরিবর্তন করতে পারেন?

0 ১২১

সম্প্রতি দেশে ঘটে যাওয়া বিভিন্ন ইস্যুতে সরগরম সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমগুলো। সমসাময়িক বিভিন্ন ইস্যুতে ভরে উঠছে ফেসবুক ওয়াল। নিউজ ফিডে দেখা যাচ্ছে বিভিন্ন নিউজ, স্ট্যাটাস এবং ছবিসহ আরও অনেক কিছু। আবার এর মধ্যেই দেখা যাচ্ছে এমন কিছু স্ট্যাটাস বা স্ক্রিনশট, যা প্রচুর শেয়ার হচ্ছে, তর্ক-বিতর্ক হচ্ছে, এমনকি ভাইরালও হয়ে যাচ্ছে। অথচ এসবের বেশিরভাগই ভুয়া বলে অভিযোগ পাওয়া যাচ্ছে। এমনও দেখা গেছে, কারও মূল স্ট্যাটাসকে বিকৃত করে স্ক্রিনশট আকারে তুলে দেওয়া হচ্ছে। যা বিদ্বেষ ছড়াচ্ছে, সমাজে ঘৃণা উসকে দিচ্ছে। স্বভাবতই প্রশ্ন উঠেছে, ফেসবুকে একজনের স্ট্যাটাস আরেকজন কি পরিবর্তন করতে পারেন?

সংশ্লিষ্টরা বলছেন, স্ট্যাটাস পরিবর্তন করা সম্ভব। এমন অনেক টুল অনলাইনে, এমনকি ফেসবুকেই আছে। সেসব ব্যবহার করে বক্তব্য বদলে বা অর্থ পরিবর্তন করে স্ক্রিনশট আকারে ফেসবুকে প্রকাশ করা সম্ভব। অন্তত তিনটি উপায়ে এসব করা যায় বলে প্রযুক্তি বিশেষজ্ঞরা জানিয়েছেন।

বিশেষজ্ঞরা বলছেন, কারও স্ট্যাটাস কপি করে ওই সব টুল ব্যবহার করে প্রকৃত স্ট্যাটাসের কোনও লাইন পরিবর্তন করে তাতে স্পর্শকাতর কোনও অংশ জুড়ে দিয়ে ফেসবুকে ছেড়ে দেওয়া সম্ভব। আর এখন অনেক ক্ষেত্রে এসবই হচ্ছে। আর এভাবে বিদ্বেষপ্রসূত কোনও স্ট্যাটাস সংশ্লিষ্ট কোনও গোষ্ঠীর বিপক্ষে দিলে তা অনেক সময় ভাইরাল হয়ে যায়।

প্রযুক্তি নিরাপত্তা বিশ্লেষক বাংলাদেশ নেটওয়ার্ক অপারেটর্স গ্রুপের (বিডিনগ) ট্রাস্টি বোর্ডের চেয়ারম্যান সুমন আহমেদ সাবির বলেন, ‘সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমকে আমরা সবকিছুর উৎস বানিয়ে ফেলেছি এবং বিশ্বাস করছি। এটা ঠিক নয়। সবকিছু বিশ্বাস করা যাবে না। আগে যাচাই করতে হবে স্ট্যাটাসটি যিনি দিয়েছেন তিনি এটি দিতে পারেন কিনা বা তার ওয়ালে গিয়ে চেক করা যে সেখানে স্ট্যাটাসটি আছে কিনা।’ কারণ হিসেবে তিনি উল্লেখ করেন, কারও স্ট্যাটাস একটু মডিফাই (বা পরিবর্তন) করে অর্থ বদলে দিয়ে তা পোস্ট দেওয়া সম্ভব। এটা মানুষকে, সমাজকে এমনকি দেশকে বিপদে ফেলতে পারে। রাজনৈতিক সংঘাত ডেকে আনতে পারে। এজন্য তিনি সবাইকে সচেতন থাকার আহ্বান জানান।

সুমন আহমেদ সাবির বলেন, ‘ভুয়া স্ট্যাটাস মানুষের বিপদ ডেকে আনতে পারে, তাকে ঝুঁকিতে ফেলতে পারে। এ ধরনের ঘটনা ঘটলে এবং তা বুঝতে পেরে চিহ্নিত করে প্রটেস্ট (প্রতিবাদ) করলে তা কমে আসবে।’ সমাজে আইনের শাসন প্রতিষ্ঠা এবং এ ধরনের অপরাধ করলে তা আইনের আওতায় নিয়ে বিচার করে দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি দিলে এসব কমতে পারে বলে মনে করেন তিনি। সম্প্রতি কোটা সংস্কার আন্দোলনে এ ধরনের অনেক ঘটনা ঘটেছে বলেও তিনি মন্তব্য করেন।

ফেসবুক ডেভেলপার গ্রুপের সাবেক ব্যবস্থাপক আরিফ নিজামী বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, ‘সম্প্রতি কারও কারও স্ট্যাটাস পরিবর্তন করে নতুন লাইন জুড়ে দিয়ে তা স্ক্রিনশট আকারে আবারও স্ট্যাটাস দেওয়া হচ্ছে। এগুলো এত নিখুঁতভাবে করা হয়ে যে কোনোভাবেই বোঝার উপায় থাকে না যে এটা ভুয়া স্ট্যাটাস।’ তিনি বলেন, ‘এসব দেখেই প্রথমে বিশ্বাস করা উচিত নয়। এর চেয়ে বরং মূল স্ট্যাটাসটি দেখে আসা যেতে পারে। সার্চ অপশনে গিয়ে একটু চেষ্টা করলেই তা খুঁজে পাওয়া সম্ভব।’

তিনি জানান, রাতারাতি অনেক আইডি তৈরি হয়ে কোনও বিষয়ে প্রচারণা চালানো বা কুৎসা রটানো হতে পারে। বিষয়টি পরীক্ষার জন্য ওই আইডি কবে ক্রিয়েট হয়েছে এবং ইউজার নেম বা ইউআরএল পরীক্ষা করলেই তা বোঝা সম্ভব। তিনি বলেন, ‘অনেক সময় ইউজার নেম বদলেও এ ধরনের স্ট্যাটাস ছাড়া হতে পারে। সে ক্ষেত্রে ইউআরএল ভালো করে পরীক্ষা করে দেখলেই মূল তথ্য অনেকাংশে উদঘাটন করা সম্ভব।’ আরিফ নিজামী জানান, প্রযুক্তি ব্যবহারকারীরা যদি প্রযুক্তিতে সচেতন না হন, শিক্ষিত না হন তাহলে এ ধরনের ভুল নিউজ বা ভুয়া স্ট্যাটাসের জয়জয়কার থামবে না। তিনি বলেন, “‘তুমি ইন্টারনেটে যা দেখো তা-ই বিশ্বাস কোরো না, যাচাই করে বিশ্বাস করো’, তাহলে এ ধরনের গুজব বা ভুয়া স্ট্যাটাস ডালপালা মেলতে পারবে না।”

তিনি উল্লেখ করেন, যারা এভাবে বিপদে পড়েন (স্ট্যাটাস পরিবর্তন হয়ে যাওয়া) তারা বুঝে হোক বা না হোক নিজেকে রক্ষা করার নিমিত্তে ফেসবুক আইডি হ্যাক হওয়ার কথা বলেন। আসলে তিনি নিজেও জানেন না যে তার আইডি হ্যাক হয়নি। একটু চেক করলেই এটা বোঝা যায়।

দেশে তিন কোটির বেশি ফেসবুক ব্যবহারকারী থাকায় এসব অপকর্মের মাধ্যম হিসেবে ফেসবুকের নামই সবার আগে চলে আসছে। ফেক টুইট বা ফেসবুক স্ট্যাটাস জেনারেটর টুলস দিয়েও এসব করা হচ্ছে বলেও জানিয়েছেন সংশ্লিষ্টরা।

অন্যদিকে একই কায়দায় মেসেঞ্জারের চ্যাট বক্সের ক্রিনশট নিয়ে ‘যা বলা হয়েছে’ তা সম্পাদনা করে নতুন লাইন যুক্ত করেও স্ট্যাটাস দেওয়া যাচ্ছে। এগুলো এতটাই নিখুঁত হচ্ছে যে যার মেসেজ বক্স থেকে স্ক্রিনশট নেওয়া হয়েছে, তিনি নিজেও ঠিক বুঝে উঠতে পারেন না এটা তার নয়।

পুলিশের অপরাধ তদন্ত বিভাগের একজন দায়িত্বশীল কর্মকর্তা পরিচয় গোপন রাখার শর্তে বাংলা ট্রিবিউনকে জানান, এ ধরনের কোনও ঘটনায় কেউ সংক্ষুব্ধ হলে তার অভিযোগ আমলে নেওয়া যেতে পারে। পরে তার অভিযোগের ভিত্তিতে সংশ্লিষ্ট স্ট্যাটাস, স্ক্রিনশট পরীক্ষা করে দেখে নিশ্চিত হওয়া যেতে পারে কাজটি তিনি করেছেন কিনা।

ওই কর্মকর্তা তার বিভাগের আইটি ফরেনসিক ল্যাবের কথা উল্লেখ করে বলেন, ‘এখানে যেসব প্রযুক্তি রয়েছে তা দিয়ে অনলাইনে ঘটে যাওয়া যেকোনও ঘটনার প্রকৃত চিত্র উদঘাটন করা সম্ভব।’

মন্তব্য
Loading...