Sylhet Express

এই ছবিটি একজন মুক্তিযোদ্ধার …

0 ২৬৫

মাস দুয়েক ধরে খাওয়াদাওয়া প্রায় বন্ধ। কয়েক চামচ দুধ কিংবা একটু সুজি-সাগু, বড়জোর এইটুকুন। কথাবার্তাও বলতে পারেন না তেমন। মুখ দিয়ে যন্ত্রণার গোঙানি বেরোয় শুধু। হাড়-জিরজিরে শরীর নিয়ে জীবন্মৃতের মতো বিছানার সঙ্গে লেপ্টে থাকেন তিনি। আর ফ্যালফ্যাল করে চেয়ে থাকেন কালচে হয়ে যাওয়া নিজের ডান পায়ের দিকে।

যে পায়ে ভর দিয়ে ১৯৭১ সালের হিরণ্ময় কীর্তি, স্বাধীন বাংলা ফুটবল দলের হয়ে বাংলাদেশের স্বাধীনতার পক্ষে জনমত তৈরির বীরত্ব—সেই পায়ে যে পচন ধরেছে! আর দু-এক দিন মাত্র। এরপর তো ডান পায়ের হাঁটুর নিচ থেকে কেটেই ফেলতে হবে আব্দুল খালেকের!

স্বাধীন বাংলা ফুটবল দল নিয়ে ধারাবাহিক এক আয়োজন করেছিল ‘কালের কণ্ঠ’। সে সূত্রেই গেল বছরের ডিসেম্বরের প্রথম সপ্তাহে খালেকের সাতক্ষীরার বাড়িতে যাওয়া। তাঁর যুদ্ধদিনের গর্বের কথা শুনেছি তখন, পরবর্তী সময়ে জীবনযুদ্ধে পরাজয়ের করুণ কাহিনিও। এমনকি ব্যাংকঋণ শোধ করতে না পারায় জেলে যাওয়ার ঘটনা পর্যন্ত। তবু তো এই বৃদ্ধ কথা বলছিলেন। হাঁটছিলেন নিজ পায়ে। সাতক্ষীরা থেকে ফেরার সপ্তাহখানেক পর ফোনে অবশ্য হাউমাউ কান্নায় জানান ডান পায়ে গ্যাংগ্রিন হওয়ার কথা। চিকিৎসকরা যে বলছেন পা কেটে ফেলতে হবে—সেই দুঃসংবাদও।

মাস তিনেকের মধ্যে সেই দুঃস্বপ্ন সত্যি হওয়ার পথে। ঢাকার সিএমএইচের বিছানায় শুয়ে এখন কাতরাচ্ছেন খালেক। চিকিৎসকরা বলে দিয়েছেন, পা কেটে ফেলা ছাড়া কোনো উপায় নেই। আর দু-এক দিনের মধ্যেই করা হবে তা। কিন্তু ওই অপারেশন করানোর মতো আর্থিক সংগতিও তো নেই স্বাধীন বাংলা ফুটবল দলের এই ডিফেন্ডারের!

তাঁর ছেলে-মেয়েরা তাই হন্যে হয়ে ছুটছেন এখান থেকে ওখানে। হাত পাতছেন পরিচিতজনদের কাছে। খালেকের ছোট ছেলে আফজাল হোসেন মিঠু কাল বিকেলে যেমন কান্নাজড়িত ভেজা কণ্ঠে বলছিলেন, ‘বাবার পা বাঁচানো যাবে না, কিন্তু বাবাকে তো বাঁচাতে হবে। এই পা নিয়ে কত ফুটবল খেলেছেন। ১৯৭১ সালের খেলার কত গল্প করেছেন আমাদের কাছে। সেই পায়ের পচনের কারণে আমার বাবা মরে যাবেন—এটি স্বাধীন বাংলাদেশে হয় কী করে!’

চারদিকের কোলাহলকে জমাট নিস্তব্ধতায় ডুবিয়ে মিঠুর ফোঁপানোর শব্দ তখন শোনা যায় শুধু।

খালেকের পায়ের এই সমস্যার শুরু হঠাৎ। ধারদেনা করে ডান চোখের ছানির অপারেশন করিয়েছিলেন। এর ইনফেকশন থেকেই কিনা পায়ে পচন। বাড়ির সামনে হাঁটার সময় এক প্রতিবেশী প্রথম দেখালেন, ডান পায়ের বুড়ো আঙুল দিয়ে রক্ত পড়ছে। দু-এক দিনের মধ্যে আঙুলটি কালচে হয়ে যায়। খালেককে নিয়ে যাওয়া হয় সাতক্ষীরা সদর হাসপাতালে। ওখানে দুদিন থাকার পর ইসলামিয়া হাসপাতালে আরো এক সপ্তাহ। দুই জায়গার ডাক্তারদের এক কথা—পা কেটে ফেলতে হবে। নইলে উন্নত চিকিৎসার জন্য নিতে হবে ঢাকায়।

কিন্তু ঢাকা যাওয়ার টাকা কোথায় খালেকের! বড় ছেলে সেনাবাহিনীতে সৈনিকের চাকরি করেন; ছোটটি এক ট্রেড ফরোয়ার্ডিং প্রতিষ্ঠানে। বেতন সামান্য; তাঁদের নিজেদের সংসারও রয়েছে। ওদিকে খালেকের সঙ্গে সাতক্ষীরায় থাকেন তাঁর স্ত্রী ও বিবাহযোগ্য দুই কন্যা। আর্থিক অনটনে তাই হোমিওপ্যাথি চিকিৎসাতেই আশ্রয় খোঁজেন সবাই।

লাভ হয় না। বুড়ো আঙুল থেকে পাশেরটি, এরপর আরেকটি—সর্বনাশা পচন এগোতে থাকে দানবের অট্টহাসিতে। পুরো পায়ের পাতাই কালচে হয়ে যায় একসময়। আর কত! মরিয়া হয়ে গত পরশু খালেককে নিয়ে আসা হয় ঢাকায়। ওখানকার সিএমএইচের চিকিৎসকরাও বলে দিয়েছেন, পা কাটার বিকল্প নেই কোনো।

খালেকের স্বজনরা তাই অর্থ জোগাড়ের জন্য ছুটছেন দ্বারে দ্বারে। পাশাপাশি রাষ্ট্রের দিকে চেয়ে থাকার কথাও জানালেন ছোট ছেলে মিঠু, ‘হাসপাতালে এক দিনেই তো প্রায় ২৫ হাজার টাকা খরচ হয়ে গেল। এত টাকা আমরা কোথায় পাব! আপনাদের কালের কণ্ঠে স্বাধীন বাংলা ফুটবল দলের খবর বেরোনোর পর তসলিম চাচাকে প্রধানমন্ত্রী ৩৫ লাখ টাকা দিয়েছেন। আমাদের ইউএনও সাহেবও তো বাবার সব খবর নিয়ে গিয়েছিলেন। কিন্তু কোনো সাহায্য পাইনি এখনো। আমার বাবার এখন খুবই খারাপ অবস্থা। তাঁর কিছু হয়ে গেলে আর টাকা দিয়ে কী করব!’

খবরটি শুনে কাল সন্ধ্যায় হাসপাতালে ছুটে যান স্বাধীন বাংলা ফুটবল দলের প্রতিষ্ঠাতা সাইদুর রহমান প্যাটেল। খালেকের স্বজনদের মতো তিনিও তাকিয়ে রাষ্ট্রের সর্বোচ্চ পর্যায়ে, ‘আমরা নিজেদের মতো চেষ্টা করছি। কিন্তু আমাদের শেষ ভরসা তো মাননীয় প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। উনি যেমন তসলিম ভাইকে দেখেছেন, তেমনি খালেক ভাইকেও দেখবেন বলে আমাদের বিশ্বাস।’

জীবন্মৃত খালেক কিছু বলতে পারেন না, তবে তাঁর হৃদয়ের গভীরেও নিশ্চয় সেই বিশ্বাসের ধুকপুকানি। আজকের মহান স্বাধীনতা দিবসে ওই বিশ্বাসটুকুনই যে ভরসা স্বাধীন বাংলা ফুটবল দলের এই বীরের!

মন্তব্য
Loading...