মেয়াদ বাড়িয়েও শেষ হয়নি বাঁধের কাজ

0 ১৯৮

২৮ ফেব্রুয়ারির মধ্যে সুনামগঞ্জের হাওরের ফসল রক্ষা বাঁধ নির্মান কাজ শেষ হওয়ার কথা ছিলো। নির্ধারিত সময়ে কাজ শেষ না হওয়ায় আরো ১৫ দিন সময় করা হয়। এই বর্ধিত সময়সীমা শেষ হয়েছে ১৫ মার্চ। অথচ এই সময়েও শেষ হয়নি বাঁধের কাজ।

এদিকে, মার্চের মাঝামাঝি সময় থেকেই সিলেটে বৃষ্টি শুরু হয়ে গেছে। বৃহস্পতিবার রাত এবং শুক্রবার দিনেও বৃষ্টি হয়েছে। বাঁধের কাজ শেষ না হওয়া ও বৃষ্টি শুরু হওয়ায় আতঙ্কে ভ’গছেন কৃষকরা।

গতবছরও মার্চের শেষ সপ্তাহে হাওরে অকাল বন্যা দেখা দিয়েছিলো। তলিয়ে গিয়েছিলো বোরো ফসল। সরকারী হিসেবেই, গত বছর ফসলরক্ষা বাঁধ ভেঙে ১৫৪ হাওরের ২ লাখ ২৩ হাজার ৮২ হেক্টর জমির বোরো ফসল তলিয়ে যায়। ক্ষতিগ্রস্ত হয় ১ লাখ ৬১ হাজার হেক্টর জমির ফসল। তবে কৃষকদের হিসাবে এ ক্ষতির পরিমাণ প্রায় দ্বিগুণ ছিল।

সুনামগঞ্জের ১১ উপজেলার প্রায় দুই লাখ হেক্টর বোরো ফসল রক্ষায় বাঁধ নির্মানের জন্য এবার সর্বোচ্চ বরাদ্দ দেয়া হয়েছে। হাওরের ১১৫ টি ক্লোজার এবং প্রায় ১৫০০ কিলোমিটার বেরিবাঁধের জন্য বরাদ্দ অনুমোদন হয়েছে ১৭৭ কোটি টাকা। বাঁধ নির্মাণে ৯৬৪ টি প্রকল্প বাস্তবায়ন কমিটি (পিআইসি)-এর অনুকূলে ইতোমধ্যে ছাড় হয়েছে ১২২ কোটি টাকা।

৯৬৪ টি পিআইসির মাধ্যমে হাওররক্ষা বাঁধের এসব কাজ বাস্তবায়ন করা হচ্ছে। ২৮ ফেব্রুয়ারি বাঁধ নির্মানের নির্ধারিত সময় শেষে বাঁধের কাজ শতকরা ৬০ ভাগ শেষ হয়েছিলো। এরপর পানি সম্পদ মন্ত্রণলয় থেকে ১৫ মার্চ পর্যন্ত কাজের সময়সীমা বর্ধিত করা হয়। কিন্তু বর্ধিত সময়সীমা পেড়িয়ে গেলেও বাঁধ নির্মাণে শতভাগ কাজ সম্পন্ন হয়নি। পানি উন্নয়ন বোর্ডের সিবে মতে, এখন পর্যন্ত ৮৫ শতাংশ কাজ শেষ হয়েছে।

জানা যায়, যেসব বাঁধের কাজ শেষ হয়েছে সেগুলোতেও নীতিমালা অনুযায়ী কমপেকশন এবং স্লোপের কাজ হয়নি। ঘাস লাগানোর কাজ চলছে ঢিমেতালে। অনেক ঝুঁিকপূর্ণ ক্লোজারে, বাঁশ, বস্তা, চাটাই, জিওটেক্সটাইল দেয়ার কাজ শুরু হয়নি।
জগন্নাথপুরে মইয়ার হাওরের কয়েকটি বাঁধে মাটির বদলে বালি ফেলা হচ্ছে। যা বৃষ্টি হলেই ধসে পড়বে বলে জানিয়েছেন কৃষকরা।

এ উপজেলায় পিআইসি ৯১টি। মাটির কাজ এখন চলমান রয়েছে ৫-৭ টিতে। কয়েকটি পিআইসি ছাড়া অধিকাংশ পিআইসির বাঁধে ঘাস লাগানো হয়নি। ঝুঁিকপূর্ণ বাঁধ ও ক্লোজারে বাঁশ, বস্তা ও চাটাইয়ের কাজ চলমান রয়েছে।

জগন্নাথপুর উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা মুহাম্মদ মাসুম বিল্লাহ বলেন, সার্বিকভাবে বাঁধ নির্মাণ কাজ ৮৮ ভাগ সম্পন্ন হয়েছে। দ্রুত শেষ করার চেষ্টা চলছে।

বালি দিয়ে বাঁধ নির্মাণ প্রসঙ্গে তিনি বলেন, যেসব প্রকল্পগুলোতে বালি মাটি পাওয়া যাবে ওইসব বালি মাটি সরিয়ে ভালো মাটি ব্যবহার করা হবে।

দক্ষিণ সুনামগঞ্জের জামখলা হাওরের ২ নং পিআইসির ঝুঁকিপূর্ণ বাঁধের কাজ এখনো শেষ হয়নি। এই বাঁধে বিশাল ফাটল দেখা দিয়েছে। ফাটল বন্ধের জন্য মাটি ফেলার কাজ চলছে। এই উপজেলার ৮০টি পিআইসির মধ্যে মাত্র দুইটি পিআইসির বাঁধে ঘাস লাগানো শেষ হয়েছে। কিছু প্রকল্পে ঘাস লাগানো চললেও অধিকাংশ প্রকল্পে ঘাস লাগানোর কাজ শুরু হয়নি।

জামালগঞ্জের মোট পিআইসি ১০০ টি। এই উপজেলার সকল প্রকল্পের মাটির কাজ শেষ। তবে ঘাস লাগানোর কাজ শেষ হয়নি। হালির হাওরের সবচেয়ে ঝুঁকিপূর্ণ ক্লোজার কালীবাড়ী। এই ক্লোজারের মাটির কাজ তড়িঘড়ি করে শেষ করা হলেও দুর্মুজ-কমপেকশন সঠিকভাবে হয়নি বলে অভিযোগ স্থানীয়দের।

জামালগঞ্জের হালির হাওরের কালিবাড়ি ক্লোজার, পাগনার হাওরের গজারিয়া ক্লোজার, মুচিবাড়ি ক্লোজার, বোগলাখালী ক্লোজার, শনি হাওরের নান্টুখালী ক্লোজার, ঝালখালী ক্লোজার, লালুর গোয়ালা ক্লোজারে এখনও জিওটেক্সটাইল দেয়া শেষ হয়নি। তবে দুই-একদিনের মধ্যেই জিওটেক্সটাইল দেয়া হবে বলে জানিয়েছেন পাউবোর উপ সহকারি প্রকৌশলী নিহার রঞ্জন দাস।

জামালগঞ্জের উপজেলা নির্বাহী অফিসার মো.শামীম আল ইমরান বললেন,‘ আমাদের মাটির কোন কাজ নেই। অধিকাংশ বাঁধে ঘাস লাগানো শেষ হয়েছে। জিওসেক্সটাইল দেয়ার কাজও দুই-এদিনের মধ্যে শেষ হয়ে যাবে। সার্বিকভাবে ৯৫ ভাগ কাজ শেষ হয়ে গেছে।’

তাহিরপুর উপজেলার শনি ও মাটিয়ান হাওরের মোট প্রকল্প ৯৭টি। এর মধ্যে শনির হাওরের মাটির কাজ শেষ হয়েছে। মাটিয়ান হাওরের পুটিমারা ও বোয়ালামারা কম্পার্মেন্টাল বাঁধসহ ১০টি পিআইসির কাজ এখন চলমান রয়েছে। তবে বৃহৎ দুইটি হাওরের কোন প্রকল্পেই ঘাস লাগানোর কাজ শুরু হয়নি। এ্ই উপজেলার বাঁধ ও ক্লোজারে জিওটেক্সটাইল ব্যবহার রাখা হয়নি।

ধর্মপাশায় মোট পিআইসি ১৩৪ টি, অধিকাংশ পিআইসির মাটির কাজ শেষ হলেও কোনো বাঁধেই ঘাস লাগানো শুরু হয়নি। ঝুঁকিপূর্ণ বাঁধে বাঁশ, বস্তা ও চাটাই সঠিকভাবে দেয়া হয়নি।

মধ্যনগরের চামরদানি ইউনিয়ন পরিষদ চেয়ারম্যান জাকিরুল আজাদ মান্না বলেন,গুরমার হাওরে ১৫ টি ও কাইলানী হাওরে ১০টি পিআইসি। এই দুইটি হাওরে অধিকাংশ পিআইসির কাজ সঠিকভাবে হয়নি। বাঁধের গোড়া থেকে মাটি তোলা হয়েছে। কোন বাঁধেই সঠিকভাবে কম্পেকশন ও স্লোপ দেয়া হয়নি। এখন কয়েকটি প্রকল্পের কাজ শেষ হয়নি। একটি বাঁধেও ঘাস লাগায়নি পিআইসি।’

বিশ্বম্ভরপুর উপজেলার মোট পিআইসি ৪১টি। বাঁধে ঘাস লাগানো হয়েছে চার ভাগের একভাগ। খরচার হাওরের হরিমনের ভাঙা ১০ নং পিআইসি, শনির হাওরের মাসুকের ও জালালের খাড়া ১৯ নং পিআইসি, শনির হাওরের ১৬ ও ২০ নং পিআইসি, আঙ্গরালী সনার হাওরের গন্ডামারা ৬ নং পিআইসির বাঁধে মাটি ফেলার কাজ এখনও চলমান রয়েছে। তবে ক্লোজারগুলোতে বাঁশ, বস্তা ও চাটাই-এর কাজ ৭০ ভাগ হয়েছে।
দিরাই উপজেলার চাপতির হাওরের কালধর সিমের গাছ থেকে বৈশাখীর পশ্চিমের ভাঙা পর্যন্ত ৫টি পিআইসি। এরমধ্যে ১টি মাটির কাজ শেষ হলেও ৪টি পিআইসির মাটির কাজ এখনও চলছে। গত বছর বৈশাখীর যে বাঁধ ভেঙে হাওরে পানি ঢুকেছিল সেটির মাটির কাজ শেষ হয়নি। একই উপজেলার টাংনি হাওরের ৬৯, ৬৯ (ক) ও ৬৯ (খ) নং পিআইসির মাটি কাজ শেষ হয়নি। এই উপজেলার কোনো বাঁধেই ঘাস লাগানোর কাজ শুরু করেনি পিআইসি। হুরা মন্দির হাওরের ৯৩, ৯৩ (ক) ও ৯৩ (খ) নং পিআইসির মাটি কাজ চলছে।

দিরাই উপজেলার টংঘর গ্রামের বাসিন্দা ইসমাইল খান বলেন,‘ টাংনির হাওরের পিআইসি নং-৬৯, ৬৯ (ক) ও ৬৯ (খ) ও হুরামন্দির হাওরের ৯৩, ৯৩ (ক) ও ৯৩ (খ) নং পিআইসির অর্ধেক কাজ এখনো শেষ হয়নি। বাঁধে মাটি কাটার কাজ চলছে।’
শাল্লা উপজেলার ১৮০ টি প্রকল্প রয়েছে। জেলার সবচেয়ে পিছিয়ে পড়া কাজ এই উপজেলার। অধিকাংশ বাঁধের মাটির কাজ শেষ পর্যায়ে। মাটির কাজ চলমান রয়েছে, ছায়ার হাওরের জোয়ারি বাঁধের কাছে ২টি ও মাউতির বাঁধের কাছে ২টি প্রকল্প, ভেরামোহনা হাওরের চাপতির বাঁধে ৩টি, উদগল বিল হাওরের ২টি, কালিকুটা হাওরের হাওয়ার খালের বাঁধে ২টি প্রকল্পের কাজ চলমান। কো¬জারের কাজ চলমান রয়েছে জয়পুর নদী ও গিলাটিয়ার। তবে কোন পিআইসিইর বাঁধেই ঘাস লাগানোর শুরু হয়নি বলে জানা গেছে।

পানি উন্নয়ন বোর্ড, সুনামগঞ্জ কার্যালয়ের নির্বাহী প্রকৌশলী (১) আবু বকর সিদ্দিক ভূঁইয়া বলেন, ‘সার্বিকভাবে ৮৫ ভাগ কাজ সম্পন্ন হয়েছে, শেষ পর্যায়ের ১৫ ভাগ কাজ রয়েছে। বাঁধ নির্মাণে মাটির কাজ শেষ, তবে কিছু বাঁধে এখনও কমপেকশন ও স্লোপের কাজ শেষ হয়নি। বাঁশ, বস্তা, চাটাই ও ঝুঁকিপূর্ণ বাঁধে জিও টেক্সটাইল দেয়া হয়নি। এসব কাজ শেষ না হলে শতভাগ সম্পন্ন বলা যাবে না। তবে আমারা দিন-রাত বাঁধ মনিটরিং করছি। কাজ দ্রুত শেষ করার লক্ষ্যে সর্বোচ্চ চেষ্টা করে যাচ্ছি। ’

নির্বাহী প্রকৌশলী (২) খুশি মোহন সরকার বলেন,‘ দিরাই-শাল্লা, জগন্নাথপুরের হাওর গুলোর পানি নেমেছে হয়েছে অনেক দেরিতে। তাছাড়া বাঁধের উপযুক্ত মাটি নিয়ে আমাদের বেগ পোহাতে হয়েছে। কাজ প্রায় শেষ পর্যায়ে চলে এসেছে। আগামী ৩-৪ দিনের মধ্যে সব কাজ শেষ হয়ে যাবে বলে আমরা আশাবাদী।’

সুনামগঞ্জের জেলা প্রশাসক মো. সাবিরুল ইসলাম বলেন,‘ হাওর গুলোর পানি নিস্কাশনে দেরী হয়েছে। যার কারণে বাঁধের কাজ শুরু করতে বিলম্ব হয়েছে। এখন জেলার অধিকাংশ পিআইসির কাজ শেষ। কিছু পিআইসির সামান্য মাটির কাজ বাকী রয়েছে। বাঁধে দ্রুত বাঁশ, বস্তা, চাটাই, জিওটেক্সটাইল ও ঘাস লাগানোর জন্য পিআইসিদের কড়া নির্দেশ দেয়া হয়েছে। আমরা আশা করছি কয়েকদিনের মধ্যে সকল কাজ সম্পন্ন হয়ে যাবে।’

মন্তব্য
Loading...