লোভাছড়া পাথর কোয়ারি : দুই শতাধিক অবৈধ গর্তের নিয়ন্ত্রক ৪৬ জন

0 ২৬৬

ধ্বংস থামানো যাচ্ছে না সিলেটের কানাইঘাট উপজেলার লোভাছড়া পাথর কোয়ারির। প্রভাবশালীরা স্থানীয় প্রশাসনকে ম্যানেজ করে চালিয়ে যাচ্ছে অবৈধ পাথর উত্তোলন। আর পাথর উত্তোলনের জন্য পাহাড়ী ভূমি, ফসলী জমি, বসতভিটাও নিশ্চিহ্ন করে দিচ্ছে তারা।

৪০/৫০ ফুট গভীর গর্ত করে ঝুঁকিপূর্ণ অবস্থায় হাজার হাজার শ্রমিক পাথর উত্তোলন করে যাচ্ছে। এর মধ্যে গর্তের পাড় ধ্বসে শ্রমিক নিহত হওয়ার ঘটনাও ঘটছে বার বার। অবৈধভাবে পাথর উত্তোলনে দুই শতাধিক গর্তের নিয়ন্ত্রক ৪৬ জনের তালিকা প্রণয়ন করেছে উপজেলা প্রশাসন। আর এ তালিকা পরিবেশ অধিদফতরের কাছে পাঠিয়ে ব্যবস্থা নেওয়ার অনুরোধ জানানো হয়েছে।

জানা গেছে, প্রাকৃতিক সৌন্দর্যের অপরূপ লীলাভূমি কানাইঘাটের লোভাছড়া পাথর কোয়ারী এলাকা। এর একদিকে দিগন্ত জোড়া মেঘালয় পাহাড়। তার কোল ঘেঁষে লোভা নদী। পাহাড় নদীর এ মিলনমোহনা পাথরখেকোদের তান্ডবে বিরাণভূমিতে পরিণত হতে চলছে। পাথরখেকো চক্র অবৈধভাবে যান্ত্রিক পদ্ধতিতে গর্ত করে পাথর উত্তোলন করা হচ্ছে, যা উচ্চ আদালত কর্তৃকও নিষিদ্ধ। সনাতন পদ্ধতিতে (হাত দিয়ে) পাথর উত্তোলনের বৈধতা থাকলেও লোভাছড়ায় ব্যবহার করা হচ্ছে। এতে ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে পরিবেশ।

সিলেটের সীমান্তবর্তী লোভাছড়া এখন যেনো গর্তপুরে পরিণত হয়েছে। পাথরখেকোরা লোভাছড়াকে ছিন্নভিন্ন করেছে। ফেলোডার, এক্সেভেটর, সেইভ মেশিন, বোমামেশিনসহ নানা যন্ত্রদানবের তান্ডব এলাকার ভূ-প্রকৃতিকে বিপদজনক করে তুলেছে। ধুলোয় ধূসর এখন গোটা এলাকা।
স্থানীয়রা জানান, প্রভাবশালী পাথরখেকো সিন্ডিকেট অবৈধভাবে গভীর গর্ত করে দিনেরাতে পাথর উত্তোলন করছে। লোভাছড়া পাথর কোয়ারিসহ আশেপাশের এলাকায় ইজারার শর্ত না মেনে অবৈধভাবে যান্ত্রিক পদ্ধতিতে শত শত গভীর গর্ত করে প্রতিনিয়ত পাথর উত্তোলন করছে। কোয়ারি এলাকায় রাতদিন যন্ত্রদানবের বিকট শব্দ এলাকার মানুষের দৈনন্দিন জীবনকে বিষিয়ে উঠেছে। এলাকার কয়েকটি গ্রামের বাড়িঘর এখন ধূলোবালিতে একাকার।

সরেজমিনে দেখা যায়, লোভাছড়া এলাকা এখন অনেকটা ধংসস্তুপে পরিণত হয়েছে। সরকারি খাস খতিয়ানের জমি গিলে খাচ্ছে পাথরখেকোরা। কোয়ারির ইজারা বহির্ভূত এলাকা থেকেও প্রতিদিন হাজার হাজার ঘনফুট পাথর উত্তোলন করা হচ্ছে। এতে করে সরকার লাখ লাখ টাকা রাজস্ব আয় থেকেও বঞ্চিত হচ্ছে।

এছাড়া এলাকার ফসলি জমি, শিক্ষা প্রতিষ্ঠান, বাজার, বসতভিটাও ধংসের মুখে। গত একযুগে মুলাগুল বাজারের অধিকাংশ জায়গা ও নয়াবাজার জামে মসজিদের জমি নদীগর্ভে বিলীন হয়েছে। লোভা নদীর উভয়পাশে ১শ’ থেকে ১৫০ ফুট গভীর গর্ত তৈরি করে পাথর উত্তোলনের কারণে নদীর গতিপথও পরিবর্তন হচ্ছে, ভাঙ্গছে উভয়পাড়। এভাবে পাথর উত্তোলন অব্যাহত থাকলে যেকোন সময় আবারও বড় ধরণের প্রাণহানির ঘটনা ঘটতে পারে বলে এলাকার লোকজন আশঙ্কা করছেন। গত চার মাসে লোভাছড়া কোয়ারিতে মাটিচাপায় ৭ শ্রমিকের মৃত্যু হয়েছে।

স্থানীয়রা জানান, পাথর দানবদের হিং¯্র থাবায় লোভাছড়ার পরিবেশ মারাত্মক ঝুঁকির মধ্যে রয়েছে। যে কোনো মুহুর্তে প্রাণহানীসহ বড় ধরণের পরিবেশ বিপর্যয় ঘটার আশঙ্কা রয়েছে। বিলীন হতে পারে বিশাল এলাকার অসংখ্য ঘরবাড়ি। হুমকির মধ্যে রয়েছে সাউদগ্রাম, ভাল্লুকমারা, সতিপুর, কান্দলা, খুকোবাড়িসহ কয়েকটি গ্রাম। পরিবেশের ক্ষতি থেকে বাঁচতে পরিবেশ অধিদফতর, উপজেলা প্রশাসন অভিযান চালালেও থামছে না অবৈধভাবে যান্ত্রিক উপায়ে পাথর উত্তোলন।

এদিকে পরিবেশ ধবংসকারী এ চক্রের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিতে গত সপ্তাহে ৪৬ জনের তালিকা তৈরি করে পরিবেশ অধিদফতরে পাঠিয়েছে উপজেলা প্রশাসন। সূত্র জানায়, লোভাছড়া কোয়ারি এলাকায় প্রায় ৩ কিলোমিটার জুড়ে অন্তত ২শ ঝুঁকিপূর্ণ গর্ত রয়েছে। এ গর্তগুলো নিয়ন্ত্রণ করছেন ৪৬ জন। এ সকল গর্তের মালিকরা স্থানীয় সাউদগ্রাম মৌজার সরকারী ১নং খাস খতিয়ানের ৬১৮, ৬১৯, ৬২০, ও ৬২১ দাগে শর্ত অমান্য করে ঝুঁকিপূর্ণ গর্ত থেকে পাথর উত্তোলন করছেন।

তালিকাভূক্তরা হলো, স্থানীয় কান্দলা গ্রামের মাসুক মোল্লা, ফয়জুল্লা, জামাল উদ্দিন, ফয়জুল্লাহ, ডাউকেরগুল গ্রামের আবদুল কাইয়ুম, আবদুল মালিক, মাহতাব উদ্দিন, মলিছ মিয়া, কয়েছ মেম্বার, নাজিম উদ্দিন, সমছু মিয়া, রিমন আহমদ, আবু তাহের, হুনা মিয়া, সাউদগ্রামের কামাল হাজী, আবদুল মতিন, বিলাল উদ্দিন, ইছাক মিয়া, আবু তাহির, ভাল্লুকমারা গ্রামের আনিছ মিয়া, সাব্বির আহমদ, ফারুক আহমদ, আবদুল গণি, জামাল উদ্দিন, আবু বক্কর, সকন মিয়া, শহিদ আহমদ, ফেদাই মিয়া, আলীম উদ্দিন, নুর উদ্দিন, মুহিব, আবদুস শুক্কুর, কিবরিয়া, নজমুল ইসলাম, নছির উদ্দিন, সাইফুল আলম, তছির মেম্বার, মড়া মিয়া, রুনু মিয়া, সফর মিয়া, মজির মিয়া, সাইফুল আলম, ইসলাম উদ্দিন, লক্ষীপ্রসাদ গ্রামের কামাল উদ্দিন, ডালাইচরের সমছু উদ্দিন, রহিম উদ্দিন।

কানাইঘাট উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা তানিয়া সুলতানা বলেন, আমরা লোভাছড়ায় ঘন ঘন অভিযান করছি। আমাদের অভিযান অব্যাহত রয়েছে আর আমাদেরকে কেউ ম্যানেজ করার প্রশ্নই উঠে না। এমনকি অসাধু ব্যবসায়ীদের নামের তালিকা করে আইনী ব্যবস্থার প্রক্রিয়া চলছে। আমরা পরিবেশ অধিদফতরের কাছে তালিকা প্রেরণ করেছি।

মন্তব্য
Loading...