Sylhet Express

কলঙ্কে আঁকা ভালোবাসা, করিমুননেসার প্রেমকাহিনী

0 ৬৪৮

সাঈদ চৌধুরী টিপু, অতিথি প্রতিবেদক :: ‘লংলা গাঁইয়া বেটি গো উঁচাত বান্ধো খোঁপা, হাইর গলাত ছিয়া ফালাইয়া দেশো রাখছো খোঁটা’ সিলেট অঞ্চলে প্রচলিত একটি প্রবাদ, মৌলভীবাজারের কুলাউড়ার লংলার এক নারীকে উদ্দেশ্য করে রচিত। প্রবাদটি বলছে, লংলার ওই নারী তার স্বামীকে হত্যা করে সারা দেশে লংলার নারীদের জন্য কলঙ্কের চিহ্ন এঁকে দিয়েছে। যাকে উদ্দেশ্য করে এই প্রবাদের জš§ তার নাম করিমুননেসা।

করিমুননেসা। লংলা পরগণার কানাইটিকরের নজম্বর আলী চৌধুরীর মেয়ে। রূপে গুণে অনন্যা। জমিদারকন্যা হলেও আভিজাত্যের প্রতি কোনো মোহ ছিলো না তার। বরং প্রজাদের প্রতি জমিদারদের অত্যাচারের গল্প শুনে তার মন কেঁদে উঠতো। ধনী-দরিদ্রের ভেদ ছিলো না তার মনে। সবাইকেই সমান চোখে দেখতেন, ভালোবাসতেন। ভালোবাসার কাঙাল-এ করিমুননেসাই- পুরো সিলেটে যেনো এক ঘৃণিত চরিত্র। হƒদয়ের ভালোবাসাই তাকে ঘৃণার পাত্রীতে পরিণত করেছে।

করিমুননেসা প্রাণচঞ্চল এক কিশোরী। মন দিয়ে বসেছিলেন বাবার সেরেস্তাদারকে (হিসাবরক্ষক)। অবসর সময়ে ওই সেরেস্তাদার পড়া দেখিয়ে দিতেন করিমুননেসাকে। পাঠের ফাঁকে ফাঁকে মনের অজান্তেই মন বিনিময় হয়ে যায় দু’জনের। দু’জনের মনের ঘরে ভালোবাসা বাসা বাঁধলেও কেউই কাউকে মুখ ফোটে কিছু বলেননি সাহসের অভাবে। এরই মাঝে বিয়ে ঠিক হয় করিমুননেসার। পাত্র ইটার জমিদার দেওয়ান মো. মনসুর ওরফে কটু মিয়া। বাবা দেওয়ান মো. সাকির মৃত্যুর পর তিনি একাই সামলাচ্ছেন ইটার বিশাল জমিদারি।

বিয়ের খবরে কান্নার ঢেউ ভাঙে করিমুননেসার চোখে। বুকে যেনো হাতুড়ির ঘা পড়তে থাকে। ভালোবাসার মানুষটিকে ছেড়ে যেতে মন মানছিলো না কিছুতেই। কিন্তু উপায় নেই বাবার কথা উল্টানোর। কাউকে বললেও কিছু হবে না। বুকের ব্যথা বুকে রেখেই মেনে নেন নিজের নিয়তি। বিয়ের পর বাবার বাড়ি ছেড়ে করিমুননেসার ঠিকানা হয় ইটায়। একা সংসারে ভালো লাগে না করিমুন নেসার। স্বামীরও সময় নেই সময় দেওয়ার। স্বামী তার ব্যস্ত জমিদারি নিয়ে। ভোগ-বিলাসেও কিছুটা সময় কাটে কটু মিয়ার। স্বামীর সংসারে ভালোবাসার দেখা পেলে হয়তো প্রথম প্রেম ভুলেও যেতেন করিমুননেসা। একাকিত্ব তার প্রেমকে আরো জাগিয়ে তুলে। বিয়ের পর বাবার বাড়িতে বেড়াতে এসে করিমুননেসার দেখা হয় তার গৃহশিক্ষকের সাথে। বুকে চাপা রাখা ভালোবাসা ফোলে উঠে জোয়ারের মতো। করিমুননেসা সিদ্ধান্ত নেন আর ফিরে যাবেন না ইটায়। এরই মাঝে কটু মিয়া বেড়াতে আসেন লংলায়। শ্বশুরবাড়িতে রহস্যজনক মৃত্যু হয় কটু মিয়ার। সন্দেহের তীর ধেয়ে যায় করিমুননেসার দিকেই। এ মৃত্যু নিয়ে সিলেটে অনেক লোকগল্প প্রচলিত আছে, কোনো গল্পমতে খোঁপার কাঁটায় গেঁথে করিমুননেসা হত্যা করেন কটু মিয়াকে। কোনো কাহিনী বলছে, গলায় ধান ভানার লাটি (ছিয়া) চেপে ধরে শ্বাসরোধ করে কটু মিয়াকে হত্যা করেন করিমুননেসা। আবার কোনো কাহিনী অনুসারে শরবতের সাথে বিষ খাইয়ে স্বামীকে হত্যা করেন করিমুননেসা।

কথিত আছে, আটকের পর ক্ষুব্ধ জনতা মাথার চুল কেটে দিয়েছিলেন করিমুননেসার। তার সে কাটা চুল কলঙ্কের চিহ্ন হিসেবে দীর্ঘদিন রাখা ছিলো আলী আমজাদের ঘড়িঘরে।

১৮৭০ সালের এ ঘটনায় মামলা উঠে সিলেটের আদালতে। করিমুননেসা তখন আত্মগোপনে। তাকে ধরার জন্য পুরস্কারও ঘোষিত হয়। পুলিশ কিছুতেই নাগাল পাচ্ছিলো না করিমুননেসার। পরে পীরের ছদ্মবেশে অনুসন্ধানে নামেন মামলার তদন্তকারী দারোগা। তার কৌশল কাজে দেয়। বিবেকের দংশনে পুড়তে থাকা করিমুননেসা পীর ভেবে তার কাছে এসে ধরা দেন। মনের শান্তির জন্য সব কিছু খুলে বলেন তিনি পীরবেশী দারোগাকে। পরে ওই দারোগাই বন্দি করেন করিমুননেসাকে। বিভিন্ন বর্ণনামতে, ওই দারোগা ছিলেন গোলাপগঞ্জের দক্ষিণভাগ গ্রামের আহসান রেজা চৌধুরী। তবে কারো দাবি, এ দারোগা সিলেটের বালাগঞ্জের (বর্তমানে ওসমানীনগর) ওসমানপুর গ্রামের সৈয়দ আম্বর আলী।

আদালতে নিজেকে বাঁচানোর কোনো চেষ্টাই করেননি করিমুননেসা। বরং বাঁচাতে চেয়েছিলেন তার ভালোবাসাকে। সব দোষ একা নিজের ঘাড়েই নিয়েছিলেন। তবে আদালত তা মানেনি। বিচারক কভার্ন ফাঁসির দ- দেন করিমুননেসাসহ ৪ জনকে। সিলেটের ইতিহাসে সেই প্রথম একসাথে এতজনের ফাঁসির দ- হয়। সিলেট কারাগারেই ফাঁসির রশিতে ঝুলেন করিমুননেসা। ‘কলঙ্কিনী’ করিমুননেসার মরদেহ কেউ গ্রহণ করেনি। বেওয়ারিশ হিসেবে তার লাশ দাফন হয় সিলেট শহরের অদূরে ষাইটঘরে (বর্তমানে দক্ষিণ সুরমা উপজেলায়)।

‘কলঙ্কিনী’ করিমুননেসাকে কেউ আর স্মরণ করে না। কিন্তু ইতিহাসে ভালোবাসার এক ‘নিষিদ্ধ’ নাম হয়েই টিকে আছেন তিনি।

মন্তব্য
Loading...