ঋণের বোঝা ছাড়াই ঈর্ষণীয় সাফল্য

0 ১৫৫

কোম্পানির অর্থসংস্থানের মূল উৎস ব্যাংকঋণ। ব্যবসায় ভালো না করলেও বড় অংকের ঋণ রয়েছে অনেক কোম্পানির। আবার ব্যতিক্রমও আছে। দেশের শেয়ারবাজারে তালিকাভুক্ত উৎপাদন খাতের হাতেগোনা কিছু কোম্পানি রয়েছে, ঋণের বোঝা ছাড়াই যাদের ব্যবসায়িক সাফল্য ঈর্ষণীয়।

শেয়ারবাজারে তালিকাভুক্ত উৎপাদন খাতের কোম্পানিগুলোর আর্থিক প্রতিবেদন বিশ্লেষণ করেছে বণিক বার্তা। তবে তালিকাভুক্ত রাষ্ট্রায়ত্ত ও বহুজাতিক কোম্পানিগুলোকে এক্ষেত্রে বিবেচনায় নেয়া হয়নি। বাদ দেয়া হয়েছে দীর্ঘদিন ধরে লোকসানে কিংবা উৎপাদন বন্ধ এমন কোম্পানিকেও। বিশ্লেষণে ন্যূনতম ১০০ কোটি টাকার বার্ষিক টার্নওভার ও কমপক্ষে ১০ বছর ধরে ব্যবসায় আছে এমন পাঁচটি কোম্পানি পাওয়া গেছে, যারা ব্যাংকঋণ ছাড়াই ভালো ব্যবসা করছে কিংবা ব্যাংকঋণ থাকলেও তা যৎসামান্য।

এ তালিকায় প্রথমেই আছে ওষুধ খাতে দেশের অন্যতম শীর্ষ কোম্পানি স্কয়ার ফার্মাসিউটিক্যালস লিমিটেড। এর পরই রয়েছে বিদ্যুৎ খাতের ইউনাইটেড পাওয়ার জেনারেশন অ্যান্ড ডিস্ট্রিবিউশন কোম্পানি লিমিটেড। ফার কেমিক্যাল ইন্ডাস্ট্রিজ লিমিটেড, অলিম্পিক অ্যাকসেসরিজ লিমিটেড ও হাওয়েল টেক্সটাইলসও আছে এ তালিকায়।

স্কয়ার ফার্মাসিউটিক্যালসের আর্থিক প্রতিবেদন অনুযায়ী, ২০১৭ সালের ৩০ জুন পর্যন্ত স্বল্প ও দীর্ঘমেয়াদিসহ কোনো ধরনের ঋণই তাদের নেই। বিপরীতে কোম্পানিটির টার্নওভার ও নিট মুনাফার অংক বেশ ঈর্ষণীয়। ঋণ ছাড়াই ব্যবসা করে সর্বশেষ হিসাব বছরে স্কয়ার ফার্মাসিউটিক্যালসের টার্নওভার ৪ হাজার ২২৮ কোটি টাকা ছাড়িয়েছে। এ সময় কোম্পানিটির নিট মুনাফা হয়েছে ১ হাজার ৬৪ কোটি টাকা। শেয়ারহোল্ডারদেরও ভালো লভ্যাংশ (৩৫ শতাংশ নগদ ও সাড়ে ৭ শতাংশ স্টক) দিয়েছে কোম্পানিটি।

পর্যাপ্ত নগদ অর্থ থাকায় ব্যাংকঋণের প্রয়োজন হয়নি বলে জানান স্কয়ার ফার্মার কোম্পানি সচিব খন্দকার হাবিবুজ্জামান। বণিক বার্তাকে তিনি বলেন, নিজেদের অর্থের সর্বোচ্চ সদ্ব্যবহারের মাধ্যমে কোম্পানি ধারাবাহিক প্রবৃদ্ধি অর্জন করছে। স্কয়ার জন্মলগ্ন থেকেই ব্যবসার ক্ষেত্রে সততা ও নৈতিকতাকে প্রাধান্য দিয়েছে। কোম্পানির পর্ষদ থেকে শুরু করে উচ্চ ও মধ্যম পর্যায়ের কর্মকর্তা সবাই এ নীতি পরিপালন করে চলেছেন। স্কয়ারের প্রাণপুরুষ স্যামসন এইচ চৌধুরী সবসময় একটি কথা বলতেন, ‘রাষ্ট্রের পাওনা পরিশোধের আগে মুনাফা হিসাব করা যাবে না।’ তার এ মনোভাব তিনি কোম্পানির সবার মধ্যে ছড়িয়ে দিতে পেরেছেন। তবে শুধু সততা দিয়েই ব্যবসায় উন্নতি হয় না, দক্ষতাও থাকতে হয়। ব্যবসায় সততা, দক্ষতা ও সুশাসন নিশ্চিত করতে পারলে একটু দেরিতে হলেও রিটার্ন আসবেই।

বিদ্যুৎ খাতের ব্যবসায় বড় অংকের বিনিয়োগ করতে হয় বলে এ খাতের কোম্পানিগুলোর ব্যাংকঋণও বেশি থাকে। এর মধ্যেও ব্যতিক্রম ইউনাইটেড পাওয়ার। ৩০ জুন ২০১৭ পর্যন্ত কোম্পানিটির কোনো ধরনের ব্যাংকঋণ ছিল না। আলোচ্য সময়ে তাদের টার্নওভার হয়েছে প্রায় ৫৭৬ কোটি টাকা। এর বিপরীতে নিট মুনাফা হয়েছে ৪১৭ কোটি টাকা। শেয়ারহোল্ডারদের লভ্যাংশের পরিমাণটাও (৯০ শতাংশ নগদ ও ১০ শতাংশ স্টক) বেশ আকর্ষণীয়।

ইউনাইটেড পাওয়ারের পরিচালক ও গ্রুপ চেয়ারম্যান হাসান মাহমুদ রাজা বণিক বার্তাকে বলেন, ঋণ আসলে ওষুধের মতো। যখন দরকার হবে, তখন তা না নেয়ার মধ্যেও বিশেষ কোনো কৃতিত্ব নেই। আবার ঋণ ছাড়াই ব্যবসা ভালো চলছে, এমন সময়েও ঋণের বোঝা প্রলম্বিত করার কোনো যুক্তি আমরা দেখি না। ইউনাইটেড পাওয়ারের প্লান্টগুলোর জন্য আমরা বিশ্বব্যাংকের আইপিএফএফ থেকে খুবই কম সুদে প্রায় সাড়ে ৩০০ কোটি টাকার ঋণ নিয়েছিলাম। এর মেয়াদ ছিল ১২ বছর। ক্যাশ ফ্লো ভালো হওয়ায় আমরা অর্ধেক সময়ের মধ্যেই তা পরিশোধ করে ঋণমুক্ত হয়ে যাই। সক্ষমতা বাড়াতে প্রেফারেন্স শেয়ার ছেড়ে প্রায় আড়াইশ কোটি টাকা মূলধন নিয়েছিলাম। পরবর্তীতে দ্রুততম সময়ের মধ্যে আইপিওর তহবিল ও ক্যাশ ফ্লো মিলিয়ে সেগুলোও পরিশোধ করে দিই। নগদ প্রবাহ ভালো থাকায় দৈনন্দিন কার্যক্রমও এখন কোম্পানির নিজস্ব তহবিল থেকেই চলছে।

বস্ত্র খাতের রফতানিমুখী প্রতিষ্ঠানগুলোর জন্য বিভিন্ন ধরনের কেমিক্যাল উৎপাদন করে ফার কেমিক্যাল লিমিটেড। শেয়ারবাজারে তালিকাভুক্ত কোম্পানিটিরও ঋণ নেই বললেই চলে। ২০১৭ সালের ৩০ জুন পর্যন্ত কোম্পানিটির স্বল্পমেয়াদি ঋণ ছিল মাত্র ২০ লাখ টাকা। এ সময়ে কোম্পানিটির টার্নওভার হয়েছে ১৪৩ কোটি টাকা। আর নিট মুনাফা দাঁড়িয়েছে ২৯ কোটি টাকায়। ২০১৬-১৭ হিসাব বছরে ফার কেমিক্যাল শেয়ারহোল্ডারদের ১০ শতাংশ স্টক লভ্যাংশ দিয়েছে।

ফার কেমিক্যালের কোম্পানি সচিব এবিএম গোলাম মোস্তফা বণিক বার্তাকে বলেন, ইকুইটির টাকায় কোম্পানির ব্যবসার ব্যয়নির্বাহ করা সম্ভব হচ্ছে। তাছাড়া প্রাথমিক গণপ্রস্তাবের (আইপিও) মাধ্যমে শেয়ারবাজার থেকে সংগৃহীত অর্থ কোম্পানির ব্যবসা সম্প্রসারণে ব্যয় করা হয়েছে। এ কারণে ব্যাংকঋণের প্রয়োজনীয়তা সেভাবে অনুভূত হয়নি।

তৈরি পোশাক খাতের রফতানিমুখী প্রতিষ্ঠানগুলোর জন্য বিভিন্ন ধরনের অ্যাকসেসরিজ উৎপাদন করে অলিম্পিক অ্যাকসেসরিজ। ২০১৭ সালের ৩০ জুন পর্যন্ত কোম্পানিটির ব্যাংকঋণ ছিল মাত্র ১ কোটি টাকা। আলোচ্য সময়ে ১৪৬ কোটি টাকা টার্নওভার ছিল কোম্পানিটির। আর নিট মুনাফা ১৭ কোটি ৮১ লাখ টাকা। সর্বশেষ হিসাব বছরে শেয়ারহোল্ডারদের ১০ শতাংশ স্টক লভ্যাংশ দিয়েছে অলিম্পিক অ্যাকসেসরিজ।

আইপিওর অর্থে ব্যাংকঋণের চাহিদা পূরণ হয়েছে বলে জানান অলিম্পিক অ্যাকসেসরিজের কোম্পানি সচিব মো. হাবিবুল্লাহ। তিনি বলেন, শেয়ারবাজার থেকে সংগৃহীত অর্থে কোম্পানির ব্যবসা সম্প্রসারিত হয়েছে। তাছাড়া উদ্যোক্তাদের ইকুইটির অর্থও ছিল। এর বাইরে নতুন করে আর কোনো তহবিলের প্রয়োজন না থাকায় ব্যাংক থেকে ঋণ নেয়া হয়নি।

কোনো ব্যাংকঋণ নেই বস্ত্র খাতের রফতানিমুখী কোম্পানি হাওয়েল টেক্সটাইলস বাংলাদেশ লিমিটেডেরও। ৩০ জুন ২০১৭ পর্যন্ত কোম্পানিটির ব্যাংকঋণের পরিমাণ ছিল শূন্য। এ সময়ে কোম্পানির টার্নওভার হয়েছে ১২১ কোটি টাকা আর নিট মুনাফা ১১ কোটি ৭৮ লাখ টাকায়। সর্বশেষ সমাপ্ত হিসাব বছরে হাওয়েল টেক্সটাইলস শেয়ারহোল্ডারদের ১০ শতাংশ নগদ লভ্যাংশ দিয়েছে। বণিক বার্তা

মন্তব্য
Loading...